মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইরান কোনো চুক্তিতে সম্মত না হলে সরাসরি ফের সামরিক অভিযান শুরু করতে প্রস্তুতÑ এমন হুশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোতে অনির্দিষ্টকালের জন্য নৌ-অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হলেও যুদ্ধের আশঙ্কা এখনও কাটেনি।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পিট হেগসেথ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ ধরে রাখতে হরমুজ প্রণালি ও বন্দরসংলগ্ন এলাকায় নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে। তার দাবি, ইরানের কার্যকর নৌ সক্ষমতা না থাকায় এই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও জানান, ইরান যদি চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে মার্কিন বাহিনী যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে।
একই ব্রিফিংয়ে মার্কিন শীর্ষ জেনারেল ড্যান কেইন জানান, ইরানকে সহায়তাকারী যেকোনো জাহাজ এবং ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। ইতিমধ্যে অবরোধ অমান্য করায় ১৩টি জাহাজকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রায় ১০ হাজারের বেশি নৌসেনা, মেরিন ও বিমানসেনা এই অবরোধ কার্যকর করছে।
জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা : মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে ইউরোপে মাত্র ছয় সপ্তাহের মতো জেট ফুয়েল মজুদ থাকতে পারে। এতে ব্যাপক হারে ফ্লাইট বাতিলের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অবরোধ উপেক্ষা করেছে ইরানি ট্যাংকার : যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ সত্ত্বেও ইরানের একটি সুপার ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছে। প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন সক্ষম এই জাহাজটির গতিপথ স্পষ্ট না হলেও ইরানি সূত্র দাবি করেছে, এটি ইমাম খোমেনি বন্দরের দিকে গেছে। এর মাধ্যমে অবরোধ কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পাল্টা হুশিয়ারি তেহরানের : যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের জবাবে কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘প্রকৃত সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে তাদের হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসিন রেজাই হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ‘পুলিশের ভূমিকা’ নিতে গেলে মার্কিন জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হবে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও সম্ভাব্য সংলাপ : উত্তেজনার মধ্যেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে পরবর্তী দফার আলোচনা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে বলে ওয়াশিংটন উল্লেখ করেছে।
এদিকে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল এবং ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে বুধবারের বৈঠকের পর ইরান প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা চালাবে। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরবর্তী দফার আলোচনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে তেহরান।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তসনিম নিউজ এজেন্সিকে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার যৌক্তিক কাঠামো মেনে চলতে হবে। অতিরিক্ত কোনো দাবি তোলা বা যুদ্ধবিরতির আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে আলোচনার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা থেকে তাদের বিরত থাকতে হবে।’
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী দফার আলোচনার পথ সুগম করতে একটি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে তেহরানে অবস্থান করছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
চীনও পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সংযত আচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ইরানও আলোচনার মাধ্যমে ‘যৌক্তিক সমাধান’-এর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা ও যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা : মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলার মধ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে ইসরায়েলি গণমাধ্যম। একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে লেবাননের প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য ফোনালাপ নিয়েও আলোচনা চলছে, যদিও এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক টানাপড়েন : ইরানে সামরিক অভিযান সীমিত করার একটি প্রস্তাব আবারও মার্কিন সিনেটে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্র এখনও খোলা থাকছে। তবে বিরোধীরা এ নিয়ে চাপ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
জ্বালানি নিষেধাজ্ঞায় নতুন সিদ্ধান্ত : যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরান ও রাশিয়ার তেলের ওপর দেওয়া সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আরও চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য এখন যুদ্ধ ও শান্তির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সামরিক অবস্থান, অন্যদিকে ইরানের পাল্টা হুশিয়ারিÑ এই দুইয়ের মধ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
