পশ্চিমবঙ্গের এপ্রিল-মে মাসের বিধানসভা নির্বাচনে আকস্মিক পরাজয়ের পর অলিখিত এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। গত ১৫ বছর ধরে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমস্ত রাজনৈতিক আক্রমণ প্রতিহত করে যে দলটি নিজেদের অপরাজেয় হিসেবে জাহির করেছিল, ভোটের ফল বিপর্যয়ের পর সেই তৃণমূলের অন্দরের ফাটল এখন পুরোপুরি প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
এত দিন একের পর এক নির্বাচনী বিজয় দিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব হলেও, এবারের পরাজয় দলের ভেতরে এক বড় ধরনের বিদ্রোহের জন্ম দিয়েছে। তৃণমূলের বহু শীর্ষ নেতাই এখন দলীয় প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কৌশল, নেতৃত্ব এবং দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
তৃণমূলের এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে দলের প্রবীণ নেত্রী কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পদত্যাগের মাধ্যমে। দলের ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট সুব্রত বক্সীর কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে তিনি কেবল দল ছাড়ার কথাই বলেননি, বরং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুরোনো আদলে দল পরিচালনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার এই ইঙ্গিত মূলত ভোট পরিচালনাকারী সংস্থা আই-প্যাকের (I-PAC) দিকে, যারা ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের বিপুল বিজয়ের নেপথ্যে কাজ করেছিল। দল গঠনের সময় থেকেই মমতার ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত কাকলি তার চিঠিতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা দুর্নীতি-সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছেন। তবে এই ক্ষোভ কেবল তার একার নয়; দলের বহু নেতাই এখন সাংগঠনিক অবক্ষয়, উপদলীয় কোন্দল এবং দলের মূল আদর্শ ‘মা, মাটি, মানুষ’ থেকে বিচ্যুত হওয়ার অভিযোগ তুলছেন।
অন্যদিকে, দলের ভেতরের এই কোন্দলকে আরও উসকে দিয়ে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন দলের আরেক প্রবীণ সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। অবশ্য দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তৃণমূল ইতোমধ্যেই একটি পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে এবং প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দলের মুখপাত্র ঋজু দত্তকে ছয় বছরের জন্য বরখাস্ত করা হয়েছে।
দলের এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মাঝেই নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন একটি প্রশাসনিক বৈঠকে তৃণমূলের তিন কাউন্সিলর আনিসুর রহমান, বীণা মণ্ডল ও মোহাম্মদ আব্দুল মতিনের অংশগ্রহণ নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তৃণমূলের একটি বড় অংশ এখন দলত্যাগের জন্য প্রস্তুত। এ ছাড়া দুই তৃণমূল বিধায়ক—ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোসের কক্ষে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেছেন। যদিও তারা একে সৌজন্য সাক্ষাৎ বলে দাবি করেছেন, কিন্তু ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে গত সপ্তাহে দিল্লির বেঙ্গল গভর্নমেন্ট গেস্ট হাউজেও শুভেন্দুর সঙ্গে দেখা গেছে। একসময় যারা মন্ত্রী হিসেবে সব সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকতেন—যেমন ইন্দ্রনীল সেন, শশী পাঁজা, ব্রাত্য বসু, মলয় ঘটক এবং অরূপ বিশ্বাস—তারা এখন জনসমক্ষ থেকে প্রায় নিখোঁজ। এর ওপর গত ১১ মে নিয়োগ কেলেঙ্কারির অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী সুজিত বসুকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) গ্রেফতার করায় দলের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ২০ দিন পার হয়ে গেলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো পরাজয় মেনে নিতে পারছেন না বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে। সম্প্রতি একটি ফেসবুক লাইভে তিনি দাবি করেন যে, কারচুপির মাধ্যমে তাদের ১৫০টি আসন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিগত চার দশকের মধ্যে এই প্রথমবার তৃণমূল নেত্রী সংসদ বা বিধানসভার কোনো কক্ষেরই সদস্য নন। বর্তমানে তিনি দলের বিধায়ক ও কাউন্সিলরদের সঙ্গে ঘরোয়া বৈঠক করলেও, কেবল ভোট-পরবর্তী সহিংসতার শিকার হওয়া মানুষদের আইনি সহায়তা দিতে কলকাতা হাইকোর্টে গিয়েই প্রথম জনসমক্ষে আসেন। তবে আদালত চত্বর থেকে বের হওয়ার সময় তাকে বিরোধীদের তোপ ও স্লোগানের মুখোমুখি হতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, দল এখন সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায় নেই। এ ছাড়া দলের পঞ্চায়েত পদ থেকে শুরু করে বিধায়কের টিকিট—সবক্ষেত্রেই আই-প্যাকের নাম করে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের যে অভিযোগ উঠেছে, তা তৃণমূলের আদর্শকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
