গাজার ধ্বংসস্তূপ সরাতে লাগবে ৭ বছর, মরদেহ দাফনের অপেক্ষায় স্বজনেরা

- Advertisements -

গাজায় চুর্ণ-বিচূর্ণ কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে আছে প্রিয়জনদের নিথর দেহ। স্বজনরা জানেন, ঠিক কোথায় আছেন তাদের মা, বাবা, সন্তান কিংবা ভাইবোন। তবু উদ্ধার সরঞ্জাম ও ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে তাদের বের করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় মাসের পর মাস, ধ্বংসস্তূপের চারপাশ ঘুরে স্মৃতি হাতড়ে ফিরছেন তারা।

২৩ বছর বয়সি লিনা আল-জাওরা তাদেরই একজন। লিনা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক হামলায় পরিবারের ২৮ সদস্যকে হারান। হামলার সময় অসুস্থ থাকায় তিনি বাড়ির বাইরে ছিলেন। পরে ফোনে তার চাচা তাকে জানান, বাড়িটি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং পরিবারের কেউ আর বেঁচে নেই।

লিনা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, খবরটি জানার পর তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন। দুই বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। তবে এখনো তিনি স্বজনদের মরদেহ দাফন করতে পারেননি।

লিনা জানান, তিনি প্রায়ই ধ্বংসস্তূপের পাশে যান, মায়ের সঙ্গে কাটানো শেষ মুহূর্তগুলো তাকে খুব ব্যথিত করে। তিনি বলেন, ‘আমার আপনজনদের দাফন করার অধিকারটুকু তো আমার থাকা উচিত। এই চূর্ণ-বিচূর্ণ ওপর দাঁড়িয়ে যন্ত্রণায় পোড়ার চেয়ে, আমি তাদের কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে চাই। তাদের কবর জিয়ারত করতে চাই।’

প্রয়োজন ১৭০ কোটি ডলার

Advertisements

জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ মূল্যায়ন অনুযায়ী, গাজায় বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন ধ্বংসস্তূপ জমে আছে। জাতিসংঘের ধারণা, পুরো ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে প্রায় ৭ বছর সময় লাগতে পারে।

গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে হাজার হাজার মরদেহ আটকে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরায়েলের সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজ-এর এক প্রতিবেদনে গাজা সিভিল ডিফেন্সের সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, এ সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার হতে পারে। গত এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, এগুলো সরাতে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ব্যয় হতে পারে।

ইউএন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের প্রধান আলেকজান্ডার ডি ক্রু বলেন, ধ্বংসস্তূপ অপসারণ ও রিসাইকেল করতে আরও সক্ষমতা প্রয়োজন। বর্তমান গাজার ৯০ শতাংশ মানুষ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাস করছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ৮০ শতাংশেরও বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। এর মধ্যে স্কুল, হাসপাতালও রয়েছে। বহু পরিবার পরিষ্কার পানি, বিদ্যুৎ, খাবার বা স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পাচ্ছেন না।

উদ্ধারকারী দলগুলো জানিয়েছে, তাদের কাছে প্রতিনিয়ত এমন অসংখ্য পরিবারের ফোন আসছে যারা ঠিকঠাক জানেন যে তাদের প্রিয়জনের মরদেহ ঠিক কোথায় চাপা পড়ে আছে। সেগুলো বের করার জন্য তারা সাহায্য চাচ্ছেন। তবে ছয় মাস আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় মরদেহ উদ্ধারের কাজ থেমে আছে।

যন্ত্রপাতির সংকটে থমকে আছে উদ্ধার অভিযান

গাজা সিটির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান প্রায় বন্ধ রয়েছে। গাজার সিভিল ডিফেন্সের ডিরেক্টর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রায়েদ আল-দাহশান বলেন, ভারী যন্ত্রপাতির তীব্র সংকটের কারণে তারা মরদেহ উদ্ধার করতে পারছেন না।

তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল গাজায় প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Advertisements

গাজার এক বাসিন্দা হামদি মালাকা (৭৬) জানান, গত নভেম্বরে জেইতুন এলাকায় বিমান হামলায় তাদের পুরো ব্লক ধ্বংস হয়ে যায়। এতে প্রায় ৭০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তার পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন।

তিনি বলেন, তার এক ছেলের পাঁচ সন্তান ছিল। ছেলে ও ছেলের স্ত্রী কেউই বেঁচে নেই। যুদ্ধবিরতির পর তারা মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা করলেও যন্ত্রপাতির অভাবে তা সম্ভব হয়নি।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি হামলায় আরও ৮৩৪ জন নিহত এবং ২ হাজার ৩৬৫ জন আহত হয়েছেন।

গাজা সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, পুরো যুদ্ধজুড়ে তাদের ১৪০ কর্মী নিহত হয়েছেন। তবুও উদ্ধারকর্মীরা কাজ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত রয়েছেন। তবে জ্বালানি, ভারী যন্ত্রপাতি ও ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে তারা এখন অনেক জায়গায় হাত দিয়েই কংক্রিট সরানোর চেষ্টা করছেন।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/gk2n
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন