ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন অবশেষে দেশে ফিরল। চোল রাজবংশের একাদশ শতাব্দীর অত্যন্ত মূল্যবান এক সেট তাম্রলিপি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের হাতে তুলে দিল নেদারল্যান্ডস। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইউরোপ সফরের প্রাক্কালে দুই দেশের এই সাংস্কৃতিক চুক্তি এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা কূটনৈতিক আলোচনার পর, নেদারল্যান্ডস সরকার এই অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ ভারতের কাছে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা দুই দেশের ক্রমবর্ধমান বন্ধুত্বের এক বড় প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউরোপে ‘লাইডেন প্লেটস’ নামে পরিচিত এই তাম্রলিপিগুলো চোল সাম্রাজ্যের টিকে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিলগুলোর অন্যতম। ২০১২ সাল থেকেই ভারত এই লিপিগুলো ফেরত পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর শেষ করে মোদি যখন তার পাঁচ দেশীয় সফরের অংশ হিসেবে নেদারল্যান্ডসে পৌঁছান, তখনই এই আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই প্রাপ্তিকে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য অত্যন্ত আনন্দের মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করে মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব ইয়েটেনের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই সমর্পণ অনুষ্ঠানের কথা জানান।
ঐতিহাসিকদের মতে, এই তাম্রলিপিগুলো চোল সম্রাট প্রথম রাজারাজা চোলের শাসনকালের, যিনি ৯৮৫ থেকে ১০১৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। ভারতের বাইরে সংরক্ষিত তামিল ঐতিহ্যের মধ্যে এটিকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হয়। প্রায় ৩০ কেজি ওজনের এই সংগ্রহটিতে মোট ২১টি তাম্রলিপি রয়েছে, যা চোল রাজকীয় সিলমোহরযুক্ত একটি ব্রোঞ্জের আংটি দিয়ে একসঙ্গে বাঁধা। এই লিপির একটি অংশ সংস্কৃতে এবং অন্য অংশটি প্রাচীন তামিল ভাষায় খোদাই করা হয়েছে।
এই নথিতে নাগাপট্টিনমের একটি বৌদ্ধ মঠের জন্য দেওয়া রাজকীয় অনুদানের বিবরণ রয়েছে, যা চোল যুগের ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গবেষকদের মতে, এই লিপিগুলো তৎকালীন দক্ষিণ ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সামুদ্রিক বাণিজ্য সম্পর্কের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করে। জানা যায়, সম্রাট প্রথম রাজারাজা চোল প্রথমে মৌখিকভাবে এই আদেশ দিয়েছিলেন, যা তালপাতায় লিপিবদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে তার ছেলে রাজেন্দ্র চোল এই বিবরণ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য তামার পাতে খোদাই করান।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্লোরেনটিয়াস ক্যাম্পার নামের এক খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক এই প্লেটগুলো নেদারল্যান্ডসে নিয়ে যান, যখন নাগাপট্টিনম ডাচদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বহু দশক ধরে এগুলো নেদারল্যান্ডসের সুরক্ষিত আর্কাইভে রাখা ছিল এবং কেবল গবেষকদেরই এটি দেখার অনুমতি ছিল। তামিল ইতিহাসবিদদের পাশাপাশি বিখ্যাত ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘পোন্নিয়িন সেলভান’-এর মাধ্যমে এই তাম্রলিপিগুলো সাধারণ মানুষের কাছেও ব্যাপক পরিচিতি পায়। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের দাবির যৌক্তিকতা স্বীকৃতি পাওয়ার পর ডাচ সরকার এই অমূল্য ঐতিহ্যবাহী সম্পদ ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
