ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। এর জেরে দিল্লির সঙ্গে এক ধরনের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে কাঠমান্ডুর। শুধু তা-ই নয়, প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র তার নিজ দেশেই আন্দোলনের মুখে পড়েছেন। এরই মধ্যে তার পদত্যাগও দাবি করেছে বিরোধী শিবির।
গত রবিবার নেপালের ফেডারেল পার্লামেন্টে দেওয়া তার প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষণে তিনি দাবি করেন- কেবল ভারতই নয়, নেপালও বিভিন্ন জায়গায় ভারতের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে। এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দেশের মধ্যকার বিতর্কিত সীমান্ত সমস্যার সমাধানের জন্য নির্দিষ্ট দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা বা মেকানিজম রয়েছে। লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ এবং কালাপানির মতো অঞ্চলগুলো নিয়ে ভারত ও নেপালের এই বিরোধ দীর্ঘদিনের।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। কাঠমান্ডুর মাইতিঘর মন্ডলাতে গত সোমবার নেপালি কংগ্রেস সমর্থিত ‘তরুণ দল’ এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ করে। তারা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা প্রার্থনা এবং এই বক্তব্য সরকারি রেকর্ড থেকে মুছে ফেলার দাবি জানান। একপর্যায়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে স্লোগান দেন।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ তার ভাষণে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সম্প্রতি আমি এমন একটি তথ্য জেনেছি, যা আপনাদের অবাক করবে। শুধু ভারতই নেপালের জমি দখল করেনি, নেপালও অনেক জায়গায় ভারতের জমি দখল করে রেখেছে।’
বালেন্দ্র শাহ আরও জানান, এই সীমান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি ও ঐতিহাসিক নথির খোঁজে নেপালি আইনপ্রণেতারা চীন ও যুক্তরাজ্যের দ্বারস্থ হয়েছেন। দক্ষিণ এশীয় গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালক নিশ্চল পাণ্ডে জানান, নেপাল এখানে যুক্তরাজ্যের মধ্যস্থতা চাচ্ছে না; বরং ১৮২৭ ও ১৮৩৪ সালের মূল ব্রিটিশ জরিপ মানচিত্রগুলো সংগ্রহ করতে চাচ্ছে।
ভারত ও নেপালের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্তের সুদূর পশ্চিম অংশ লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ এবং কালাপানি অঞ্চল নিয়ে দুই দেশের মূল বিরোধ। এই দ্বন্দ্বের ইতিহাস মূলত ১৮১৬ সালে তৎকালীন নেপাল ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘সুগৌলি চুক্তি’র সঙ্গে জড়িত। চুক্তি অনুযায়ী কালী নদীর পশ্চিমের ভূখণ্ড নেপাল ছেড়ে দিলেও কালী নদীর প্রকৃত উৎপত্তিস্থল কোথায়, তা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি এবং চুক্তির সঙ্গে নো মানচিত্রও সংযুক্ত ছিল না।
নেপালের দাবি, কালী নদীর উৎস লিম্পিয়াধুরায়। অন্যদিকে দিল্লির দাবি, নদীটির উৎপত্তি লিপুলেখ থেকে। এই দুই নদীর মধ্যবর্তী বিতর্কিত অঞ্চলেই ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর থেকে ভারতীয় সেনা মোতায়েন রয়েছে।
এর আগে নেপাল প্রস্তাব করেছিল, নেপাল থেকে সরাসরি বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত একটি করিডরের জন্য জমি যদি ভারত নেপালকে হস্তান্তর করে, তা হলে নেপালও ভারতকে ৩১০ বর্গকিলোমিটার এলাকা হস্তান্তর করতে পারে।
২০১৯ সালে ভারতশাসিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করার সময়ে যে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে ভারত, সেখানে কালাপানিকে ভারতীয় ভূখণ্ডে দেখানো হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় নেপাল তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মানচিত্রে কালাপানি, লিপুলেখ এবং লিম্পিয়াধুরাকে তাদের নিজেদের অঞ্চল হিসাবে দেখিয়েছিল।
