যেভাবে ধরা পড়লেন খালিস্তানপন্থি নেতা অমৃতপাল সিং

- Advertisements -

পাঞ্জাবের মোগা জেলার রোডে গ্রামটি রোববার (২৩ এপ্রিল) সকালেই চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল পাঞ্জাব পুলিশের একটি বিরাট দল। তাদের কাছে খবর ছিল, ৩৭ দিন ধরে পলাতক বিচ্ছিন্নতাবাদী খালিস্তানপন্থি নেতা অমৃতপাল সিং ওই গ্রামেই লুকিয়ে রয়েছেন।

রোডে গ্রামটি পাঞ্জাবে বেশ পরিচিত। এটিই খালিস্তানি আন্দোলনের জনক জার্নেইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের জন্মস্থান। ঘটনাচক্রে গত বছর এ গ্রামেই আয়োজন করা হয়েছিল অমৃতপাল সিংয়ের ‘দস্তরবন্দী’ (নেতৃত্বের পাগড়ি বাঁধার অনুষ্ঠান), যার পর তিনি ‘ওয়ারিস পাঞ্জাব দি’ গোষ্ঠীর নতুন নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

দস্তরবন্দীর প্রায় সাত মাস পর সেই রোডে গ্রামের গুরদোয়ারাতেই শেষপর্যন্ত পাঞ্জাব পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন অমৃতপাল সিং।

এরপরই পাঞ্জাব পুলিশের পক্ষ থেকে টুইটারে জানানো হয়, অমৃতপাল সিংকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

বিকেলের পাঞ্জাব পুলিশের আইজি (মহাপরিচালক) সুখচেইন সিং গিল বলেন, অমৃতপাল সিং যে রোডে গ্রামেই রয়েছেন, সে বিষয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ছিল। তাকে এমনভাবে ঘিরে ফেলা হয়েছিল যে, পালানোর কোনো পথ ছিল না।

অর্থাৎ পুলিশপ্রধান দাবি করেছেন, অমৃতপাল সিং স্বেচ্ছায় নন, বরং বাধ্য হয়েই আত্মসমর্পণ করেছেন।

গ্রেফতারের পরই ডিব্রুগড়ে
আত্মসমর্পণের কিছুক্ষণ পরেই অমৃতপাল সিংকে ভারতের অন্য প্রান্তে আসামের ডিব্রুগড়ে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ডিব্রুগড়ের শতবর্ষী পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগার দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে সুরক্ষিত জেল হিসেবে পরিচিত। সেখানেই রাখা হয়েছে হাই-প্রোফাইল এ বন্দিকে।

অমৃতপাল সিংয়ের আট ঘনিষ্ঠ সঙ্গী গত মাস থেকেই ওই জেলে রয়েছেন এবং তাদের আটক রাখা হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায়। কঠোর এই আইনে কোনো চার্জ না এনেই যেকোনো ব্যক্তিকে এক বছর পর্যন্ত আটকে রাখা যায়।

খালিস্তানপন্থি নেতা অমৃতপাল সিংয়ের বিরুদ্ধেও একই আইন প্রয়োগ করা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

পাঞ্জাব পুলিশ অবশ্য রাজ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তারা আরও বলেছে, ভালোভাবে যাচাই-বাছাই না করে কেউ যেন কোনো তথ্য শেয়ার না করেন এবং গুজব না ছড়ান।

এর আগে, গত ১৮ মার্চ থেকে অমৃতপাল সিংয়ের সন্ধানে পাঞ্জাব পুলিশ কার্যত গোটা দেশে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছিল। ১৮ মার্চ বিকেলে জলন্ধরের কাছে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদী এ নেতা লাপাত্তা ছিলেন। অবশেষে ৩৭ দিনের মাথায় তার নাগাল পেলো পুলিশ।

কে এই অমৃতপাল সিং
কয়েক মাস আগেও বাকি ভারতে কেন, পাঞ্জাবেও অনেকে অমৃতপাল সিংয়ের নাম শোনেননি।

অমৃতসরের কাছে জাল্লুপুর খেড়া গ্রামের এ যুবক স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েই বছর দশেক আগে পরিবারের পরিবহন ব্যবসার দেখাশোনা করতে দুবাই পাড়ি দিয়েছিলেন। ভারতের পাসপোর্টধারী হলেও তিনি কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা।

ভারতে কৃষক আন্দোলনের সূত্র ধরে ব্যাপক পরিচিতি যাওয়া পাঞ্জাবি গায়ক ও সমাজকর্মী দীপ সিধু ২০২১ সালের শেষের দিকে ‘ওয়ারিস পাঞ্জাব দি’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন বা এনজিও গড়ে তোলেন। পরের বছর সড়ক দুর্ঘটনায় সিধুর মৃত্যু হলে সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় এবং সেটি ভেঙে একাধিক টুকরো হয়ে যায়।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ‘ওয়ারিস পাঞ্জাব দি’র একটি গোষ্ঠী তাদের নতুন নেতা হিসেবে বেছে নেয় অমৃতপাল সিংকে, যিনি তার মাত্র কিছুদিন আগেই ভারতে ফিরেছিলেন।

ভিন্দ্রানওয়ালের নামাঙ্কিত গুরদোয়ারাতেই সেদিন ব্যবস্থা হয়েছিল লঙ্গরের, যেখানে হাজার হাজার লোক ‘সেবা’ পেয়েছিলেন।

সেদিনের পর থেকেই অমৃতপালের অনুগামীরা তাকে ভিন্দ্রানওয়ালের সার্থক উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছেন। মিডিয়াতেও তাকে ভিন্দ্রানওয়ালে ২.০ বলে বর্ণনা করা হচ্ছে।

সংগঠনের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একাধিক সাক্ষাৎকারে ও বক্তৃতায় এই তরুণ নেতা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, তিনি গুরু ভিন্দ্রানওয়ালের মতোই খালিস্তানের পক্ষে লড়ে যাবেন। তার ধর্মীয় বক্তৃতা শুনতে সভায় প্রচুর ভিড় হতো।

সভা-সমিতিতে বা জলসায় অমৃতপাল সিং বারবারে একটা কথাই বলছেন, শিখদের মধ্যে গত দেড়শ বছরে ক্রীতদাসের মনোভাব ঢুকে গেছে। তারা আগে ছিল ব্রিটিশদের দাস, এখন হয়েছে হিন্দুদের দাস। এ অবস্থা পাল্টে শিখ শাসন ফিরিয়ে আনতে হবে।

সবসময় ঘনিষ্ঠ ১০-১৫ জন অনুচর সঙ্গে নিয়ে ঘোরাফেরা করতেন অমৃতপাল সিং। তার গাড়িবহরেও থাকতো অন্তত আধডজন এসইউভি। আর ভিন্দ্রানওয়ালের মতোই সবসময় কোমরে থাকতো তরবারির সাইজের বিশাল একটি কিরপান।

গত ২শে ফেব্রুয়ারি অমৃতপাল সিংয়ের কয়েকশ সশস্ত্র অনুগামী অমৃতসরের কাছে আজনালাতে তাদের এক সহকর্মীকে ছাড়িয়ে আনতে থানায় আক্রমণ চালায়। হামলার সময় তাদের মুখে ছিল খালিস্তানের স্লোগান। আগ্নেয়াস্ত্র ও কিরপান নিয়ে চালানো সেই হামলায় বহু পুলিশ সদস্য আহত হন।

এর কিছুদিন পরেই কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পাঞ্জাবের আম আদমি পার্টি সরকার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় অমৃতপাল সিংকে ধরতে অভিযান চালানো হবে। এরপর আজ (রোববার) তাকে গ্রেফতার করা হলো।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/q767
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন