ইরানে নবজাতকদের জটিল বংশগত বিপাকজনিত রোগ শনাক্তে উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বর্তমানে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুকে বিনামূল্যে ৫৮ ধরনের মেটাবলিক রোগের পরীক্ষা করা হচ্ছে, যেখানে ব্যবহৃত হচ্ছে ট্যান্ডেম মাস স্পেকট্রোমেট্রি (এমএস/এমএস) প্রযুক্তি।
ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, এই চিকিৎসা ও পরীক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বহুল আলোচিত ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ব্যবহার। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা ক্ষেত্রে এমন বিস্তৃত নবজাতক স্ক্রিনিং কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্ষম দেশের সংখ্যা বিশ্বে খুবই কম। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক থাকলেও, দেশটি বহু বছর ধরে একই প্রযুক্তিকে শিশুদের জীবনরক্ষায় ব্যবহার করে আসছে।
দুই দশকের বেশি সময়ের কর্মসূচি
ইরানে নবজাতক স্ক্রিনিং কার্যক্রম শুরু হয় ২০০২ সালে। শুরুতে জন্মগত হাইপোথাইরয়েডিজম, ফেনাইলকিটোনুরিয়া (পিকেইউ) এবং গ্লুকোজ-৬-ফসফেট ডিহাইড্রোজেনেজ ঘাটতি শনাক্তে পরীক্ষা চালু করা হয়। পরবর্তীতে পারমাণবিক চিকিৎসা প্রযুক্তির অগ্রগতির মাধ্যমে পরীক্ষার পরিধি বাড়িয়ে বর্তমানে ৫৮টি মেটাবলিক রোগ শনাক্তের সক্ষমতা অর্জন করেছে দেশটি।
বর্তমানে জন্মের তৃতীয় থেকে পঞ্চম দিনের মধ্যে নবজাতকের গোড়ালি থেকে কয়েক ফোঁটা রক্ত সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। এর মাধ্যমে অ্যামিনো অ্যাসিড বিপাকজনিত সমস্যা, অর্গানিক অ্যাসিডেমিয়া, ফ্যাটি অ্যাসিড অক্সিডেশন ডিজঅর্ডার এবং ইউরিয়া সাইকেল ত্রুটির মতো জটিল রোগ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশে বছরে প্রায় ৫৪ হাজার নবজাতকের স্ক্রিনিং করা হয়। সেখানে ৫৬টি কেন্দ্রের মাধ্যমে টানা সাত বছর শতভাগ স্ক্রিনিং কভারেজ বজায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার
এই কর্মসূচির মূল ভিত্তি ট্যান্ডেম মাস স্পেকট্রোমেট্রি প্রযুক্তি, যা শুকনো রক্তের নমুনায় অস্বাভাবিক বিপাকীয় উপাদান শনাক্ত করতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তির ক্যালিব্রেশন ও কোয়ালিটি কন্ট্রোলে রেডিওআইসোটোপভিত্তিক উপাদান ব্যবহৃত হয়, যা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থেকে উৎপাদিত।
ইরান দাবি করছে, তাদের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গবেষণা চুল্লিতে ব্যবহার করে মলিবডেনাম-৯৯ উৎপাদন করা হয়, যা পরবর্তীতে টেকনেশিয়াম-৯৯এম-এ রূপান্তরিত হয়। এই আইসোটোপ বিশ্বজুড়ে ক্যানসার ও হৃদরোগ নির্ণয়সহ নানা চিকিৎসা পরীক্ষায় ব্যবহৃত হয়।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ২০২২ সালের মার্চে নিশ্চিত করে যে, ইরান তাদের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি অংশ মলিবডেনাম-৯৯ উৎপাদনের লক্ষ্যবস্তু তৈরিতে ব্যবহার করছে।
ইরানের মতে, উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহারে কম উপাদান দিয়ে বেশি আইসোটোপ উৎপাদন সম্ভব হয় এবং তুলনামূলক কম তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই স্ক্রিনিং
বিশ্বের তুলনায় ইরানে বংশগত মেটাবলিক রোগের হার তুলনামূলক বেশি। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ফার্স প্রদেশের ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৯ নবজাতকের মধ্যে ১৩৯টি নিশ্চিত মেটাবলিক রোগ শনাক্ত হয়। অর্থাৎ প্রতি এক হাজার নবজাতকের মধ্যে একজন আক্রান্ত, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় প্রতি আড়াই হাজারে একজন।
সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে ফেনাইলঅ্যালানিন বিপাকজনিত রোগ। এছাড়া শর্ট-চেইন অ্যাসাইল-কোএ ডিহাইড্রোজেনেজ ঘাটতি ও ৩-মিথাইলক্রোটোনাইল-কোএ কার্বক্সিলেজ ঘাটতির ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।
চিকিৎসকদের মতে, জন্মের সময় এসব রোগের লক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে বোঝা যায় না। তবে দ্রুত শনাক্ত করা গেলে বিশেষ খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সহায়তা
রোগ শনাক্তের পর আক্রান্ত শিশুদের বিশেষায়িত মেটাবলিক ক্লিনিকে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও নার্সদের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।
ফেনাইলকিটোনুরিয়া, ম্যাপল সিরাপ ইউরিন ডিজিজ, প্রোপিওনিক অ্যাসিডেমিয়া ও মিথাইলম্যালোনিক অ্যাসিডেমিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষ খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
ইরান বর্তমানে ৬৯ ধরনের ডায়াগনস্টিক ও থেরাপিউটিক রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন করছে এবং বছরে ১০ লাখের বেশি রোগীকে সেবা দিচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
২০২৫ সালে দেশটিকে পারমাণবিক চিকিৎসা প্রযুক্তিতে বিশ্বের শীর্ষ তিন উৎপাদনকারীর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। টেকনেশিয়াম-৯৯এম, ফ্লোরিন-১৮ এবং লুটেশিয়াম-১৭৭ উৎপাদনেও স্বনির্ভরতা অর্জনের দাবি করেছে তেহরান।
ইরানের গবেষকদের ভাষ্য, ভবিষ্যতে আরও নতুন রোগ স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে এই প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।
