জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মেরু অঞ্চলের বরফ যত গলছে, বিশ্ব রাজনীতির উত্তাপ যেন ততটাই বাড়ছে। উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে এখন প্রকাশ্য লড়াইয়ে নেমেছে বিশ্বের তিন প্রধান শক্তি; রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে রাশিয়ার একার আধিপত্য থাকলেও সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার জেদ এবং চীনের ‘নিয়ার-আর্কটিক’ রাষ্ট্র হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এই লড়াইকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বর্তমানে আর্কটিক অঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি ভূমি এবং সমুদ্রসীমা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই অঞ্চলের মোট জিডিপির দুই-তৃতীয়াংশই আসে মস্কোর পকেট থেকে। তবে ন্যাটোতে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের অন্তর্ভুক্তির পর এখন উত্তর মেরু কার্যত দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। যার একদিকে রয়েছে রাশিয়া এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট।
সামরিক উপস্থিতির দিক থেকে রাশিয়া কয়েক দশক ধরেই বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে। সিমন্স ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, এই অঞ্চলে বর্তমানে ৬৬টি সামরিক সাইট রয়েছে; যার মধ্যে ৩০টিই রাশিয়ার। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে ও গ্রিনল্যান্ড মিলিয়ে ন্যাটোর হাতে রয়েছে ৩৬টি ঘাঁটি। যদিও শক্তির বিচারে ন্যাটো এখনো এগিয়ে আছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। কিন্তু রাশিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন বহর এবং ড্রোন ও মিসাইল প্রযুক্তির আধুনিকায়ন পেন্টাগনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্কটিক কাউন্সিল এখন কেবল নামমাত্র একটি সংস্থায় পরিণত হয়েছে।
এই লড়াই কেবল সামরিক আধিপত্যের নয় বরং এর পেছনে রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক হাতছানি। বরফ গলার কারণে এখন উত্তর মেরু দিয়ে এমন সব জাহাজ চলাচলের পথ উন্মুক্ত হচ্ছে। যা দুই দশক আগেও ছিল অকল্পনীয়। ‘নর্দান সি রুট’ ব্যবহার করে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে এখন সুয়েজ খালের তুলনায় অর্ধেক সময় লাগছে। রাশিয়া বর্তমানে এই রুট ব্যবহার করে চীনের কাছে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস রপ্তানি করছে। অন্যদিকে চীন নিজেকে ‘নিয়ার-আর্কটিক’ রাষ্ট্র ঘোষণা করে এই অঞ্চলে ‘পোলার সিল্ক রোড’ তৈরির স্বপ্ন দেখছে। এমনকি ২০২৪ সালে রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে এই এলাকায় টহল দিয়ে নিজেদের বন্ধুত্বের জানান দিয়েছে।
অর্থনৈতিক এই সমীকরণে গ্রিনল্যান্ড এখন সবচেয়ে বড় ঘুঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন যে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড দখল বা কেনা অত্যন্ত জরুরি। ডেনমার্কের এই স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপে লুকিয়ে আছে কয়লা, তামা, সোনা এবং বিরল খনিজ উপাদানের বিশাল ভাণ্ডার। যদিও বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এই দুর্গম এলাকা থেকে সম্পদ আহরণ করা পরিবেশের জন্য বিপর্যয়কর হবে। কিন্তু খনিজ সম্পদের লোভ আর ভূ-রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে সেই সতর্কবার্তা এখন ফিকে হয়ে আসছে। এক সময়ের শান্ত ও বরফে ঢাকা উত্তর মেরু এখন তাই বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে উত্তপ্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
