ট্রাম্পের সর্বোচ্চ চাপেও কিউবার পরিণতি ভেনেজুয়েলার মতো হবে না, নেপথ্যে কী কারণ?

- Advertisements -

ক্যারিবীয় দ্বীপদেশ কিউবা ভয়াবহ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে রয়েছে। এরই মধ্যে দেশটির ওপর সর্বোচ্চ চাপপ্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মূলত কয়েক দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ কিউবা।

ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, এবার কিউবার ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে কারাকাস (ভেনেজুয়েলা) হাভানার অন্যতম প্রধান সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও কিউবা কেন আরেকটি ‘ভেনেজুয়েলা’ হয়ে উঠবে না, নেপথ্যে রয়েছে কিছু কারণ। যেমন:-

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিউবার দায়িত্ব নেবে কে?
ভেনেজুয়েলায় ঝটিকা অভিযানে মার্কিন বাহিনী মাদুরোকে আটক করার পর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশটির দায়িত্ব নেন এবং বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। মাদুরোর ডেপুটি বা উপ-প্রধান ছিলেন রদ্রিগেজ। কিন্তু কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল কিংবা সাবেক প্রেসিডেন্ট ৯৪ বছর বয়সি রাউল কাস্ত্রোর এমন কোনো নির্দিষ্ট ডেপুটি নেই। উল্লেখ্য, হাভানার ওপর চাপ বাড়াতে চলতি সপ্তাহেই রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন (ইনডিক্টমেন্ট) করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ডালাসের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাসের ইউএস-ল্যাটিন আমেরিকা সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অরল্যান্ডো পেরেজ বলেন, কিউবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত সুসংগঠিত। তারা বিকল্প বা সম্ভাব্য যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির উত্থানকে পদ্ধতিগতভাবেই উপড়ে ফেলেছে। তাছাড়া ভেনিজুয়েলায় মারিয়া করিনা মাচাদোর মতো একজন জনপ্রিয় বিরোধীদলীয় নেতা ও নোবেলজয়ী রয়েছেন, যিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েও ক্ষমতায় বসতে পারেননি। তিনি এ বছরই মুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে ফেরার আশা করছেন। কিন্তু কিউবায় এমন কোনো বিকল্প জননেতা নেই।

Advertisements

সম্প্রতি সাবেক প্রেসিডেন্টের নাতি রাউল রদ্রিগেজ কাস্ত্রো হাভানায় সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফের সাথে একটি বিরল বৈঠকে মিলিত হন, যা নিয়ে গুঞ্জন ওঠে যে তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারেন। তবে কিউবান সরকারে তরুণ কাস্ত্রোর কোনো আনুষ্ঠানিক পদ নেই এবং তিনি নিজের পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন এমন সম্ভাবনাও কম।

সুবিধা ও ঝুঁকি কোন পক্ষ কতটুকু?
ফিদেল কাস্ত্রোর ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে কিউবা কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হয়ে আছে। অতীতে কিউবাকে ফ্লোরিডা থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরের এক হুমকিস্বরূপ সোভিয়েত স্যাটেলাইট রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হতো। সম্প্রতি একে পশ্চিম গোলার্ধে চীনের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাব্য ঘাঁটি হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছিল। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ার মনোযোগ এখন অন্যদিকে এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কিউবার বর্তমান সামরিক সক্ষমতাও আগের মতো নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিউবায় অস্থিরতা তৈরি হলে তা বড় ধরনের অভিবাসন সংকট তৈরি করতে পারে। মার্কিন অবরোধের কারণে দেশটির মানুষ এমনিতেই বিদ্যুৎহীন মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। যুদ্ধ বা বিশৃঙ্খলা শুরু হলে তারা দলে দলে দেশ ছেড়ে পালাতে পারে। পাশাপাশি কিউবার সামরিক বাহিনী ভেনিজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি আদর্শিক এবং ঐক্যবদ্ধ। ফলে তারা সহজে আত্মসমর্পণ করবে না। গত জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলায় মাদুরোর নিরাপত্তা দেওয়ার সময় বেশ কয়েকজন কিউবান এজেন্ট নিহত হলেও, যারা বেঁচে ফিরেছেন তারা মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধকৌশল খুব কাছ থেকে দেখেছেন। এছাড়া রাশিয়া ও চীনের সাথে দীর্ঘদিনের সহযোগিতার ফলে বেশ উন্নত কিউবার গোয়েন্দা ও নজরদারি প্রযুক্তি।

কিউবা থেকে পাওয়ার কী রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের?
ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলো এই দক্ষিণ আমেরিকান দেশটিতে তেল উৎপাদনের জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছে, যার ফলে দেশটির রপ্তানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কিউবার এমন কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি, মার্কিন অবরোধ ও তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকির কারণে এমনিতেই কিউবার অর্থনীতি বিপর্যস্ত। এর ওপর দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত পর্যটন শিল্প ক্যারিবীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় মান ও মূল্যের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কিউবা নীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিওকে, যিনি কিউবা প্রশ্নে বরাবরই কট্টরপন্থী। ফ্লোরিডায় জন্ম নেওয়া কিউবান অভিবাসীর সন্তান রুবিও এর আগেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়েছেন এবং ভবিষ্যতে আবারও লড়বেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিউবায় বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারলে তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সফল হবে। তবে এই অভিযান ব্যর্থ হলে তা বড় ঝুঁকি তৈরি করবে, বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বিশাল বাজেট ঘাটতিতে রয়েছে এবং ইরানে প্রতিদিন বিলিয়ন ডলারের ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালাচ্ছে।

Advertisements

আইনি জটিলতার বিষয়গুলো কী কী? 
১৯৯৬ সালের ‘হেলমস-বার্টন অ্যাক্ট’ বা আইনের কারণে কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের হাত অনেকটাই বাঁধা। এ আইন অনুযায়ী, কিউবায় একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার গঠনসহ সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবর্তন না এলে কয়েক দশকের পুরোনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়। ভেনিজুয়েলায় মাদুরোকে সরিয়ে ট্রাম্প বাণিজ্যিক সম্পর্কে বদল এনেছেন ঠিকই, কিন্তু সেখানে মুক্ত নির্বাচনের কোনো রূপরেখা না দিয়েই বর্তমান সরকারকে বহাল রাখা হয়েছে। কিউবার ক্ষেত্রে আইনিভাবে তা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না কিউবান কর্মকর্তারা নাটকীয় কোনো পরিবর্তন আনছেন—যা তারা এখন পর্যন্ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে আসছেন।

কিউবার পরিস্থিতি আরও জটিল কারণ দেশটির অর্থনীতিতে কোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন খাত বা প্রাইভেট সেক্টর নেই। পুরো অর্থনীতি মূলত ‘গায়েসা’ নামের একটি সামরিক কনগ্লোমারেট বা জোটের নিয়ন্ত্রণে, যার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দ্বীপ রাষ্ট্রটির শীর্ষ হোটেল, প্রধান বন্দর, সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক, সুপার মার্কেট এবং গ্যাস স্টেশনগুলো পরিচালনা করে এ সামরিক জোটই।

এছাড়া, ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার অভিযানকে এই বলেও ন্যায্যতা দিয়েছে যে, ‘মাদক-সন্ত্রাসবাদে’ জড়িত ছিল মাদুরোর সরকার। কিন্তু কিউবার কর্মকর্তারা এমন অভিযোগের সম্মুখীন হননি। তাছাড়া, কিউবার সরকার দাবি করছে যে, মাদক পাচারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সহযোগিতা করে আসছে তারা।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/79gy
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন