হাইপোটোনি, চোখের এক ধরনের বিরল রোগ। এই রোগের চিকিৎসায় যুগান্তকারী সাফল্য পেয়েছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। তাদের নতুন এক ইনজেকশন আবিষ্কার করেছেন। সেটি প্রয়োগে প্রথমবারের মতো দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন এক রোগী।
জানা গেছে, ওই রোগীর নাম নিকি গাই। তিনি যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে তিনি জানিয়েছেন, “আমি শুধু আঙুল গুনতে পারতাম, সবকিছুই খুব ঝাপসা দেখাত। (নতুন এই চিকিৎসা নেওয়ার পর) এখন আমি দেখতে পারছি।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, লন্ডনের মুরফিল্ডস হাসপাতালে হাইপোটোনির চিকিৎসা করা হচ্ছে। মুরফিল্ডসের বিশেষজ্ঞরা স্বল্পমূল্যের, স্বচ্ছ ও পানি-ভিত্তিক হাইড্রোক্সিপ্রপাইল মিথাইলসেলুলোজ নামের একটি জেল তৈরি করেছেন। এটি চোখের মূল অংশে নিয়মিত ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করার পরই সাফল্য পান তারা। সাধারণত প্রতি তিন থেকে চার সপ্তাহ পরপর একটি করে ইনজেকশন দেওয়া হয়। ১০ মাসের কোর্স পূর্ণ করার পরই সুফল দেখতে পান রোগীরা।
হাইপোটোনি রোগের ফলে চোখের ভেতরের চাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যায়, ফলে চোখ নিজেই ভেঙে বা বসে যেতে শুরু করে। ২০১৭ সালে ছেলের জন্মের পরপরই নিকির চোখের সমস্যা শুরু হয়। তখন তার ডান চোখে প্রচুর সিলিকন তেল দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, হাইপোটোনির কারণে চোখটি তার স্বাভাবিক আকৃতি হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু সিলিকন তেলের চিকিৎসায় তেমন কোনও উপকার পাননি। কয়েক বছর পর তার বাঁ চোখেও একই সমস্যা দেখা দেয়।
নিকির চিকিৎসক হ্যারি পেট্রুশকিন জানান, তারা সিদ্ধান্ত নেন—চোখের ভেতর এমন কিছু ভরাট করা, যার ভেতর দিয়ে দেখা সম্ভব।
তিনি বলেন, “যার মাত্র একটি চোখ কোনওরকম কাজ করছে, তার ওপর এমন একটি পরীক্ষামূলক চিকিৎসা প্রয়োগ করা নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা এটিকেই সমাধান হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম, আর অবিশ্বাস্যভাবে এই চিকিৎসা কাজ করেছে।”
“যে মানুষটির বাস্তবিক অর্থেই দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর কথা ছিল… তিনি এখন স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। এটা অসাধারণ ব্যাপার,” যোগ করেন পেট্রুশকিন।
তিনি আরও বলেন, “এই চিকিৎসার মাধ্যমে হাজারো মানুষের দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
তবে চোখের পেছনের কোষগুলো এখনও কার্যকর আছে কি না, তার ওপর এই চিকিৎসা অনেকাংশে নির্ভর করে বলে জানান পেট্রুশকিন।
আইনগতভাবে গাড়ি চালানোর জন্য যে দৃষ্টিশক্তি প্রয়োজন, তার থেকে নিকি এখন মাত্র এক লাইন পিছিয়ে রয়েছেন। তবে প্রায় দৃষ্টিহীন অবস্থা থেকে অনেকটাই উন্নতি হয়েছে তার। আগে তাকে কাছের জিনিস দেখতে ম্যাগনিফাইং গ্লাস ব্যবহার করতে হতো এবং ঘরের ভেতর ও বাইরে চলাচল করতে হতো মূলত স্মৃতির ওপর ভর করে। এখন কোনও কিছুর সাহায্য ছাড়াই দৈনন্দিন সব কাজ সম্পাদন করতে পারছেন তিনি।
মুরফিল্ডস আই চ্যারিটির অর্থায়নে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৩৫ জন রোগীর ওপর এই চিকিৎসা প্রয়োগ করা হয়েছে। সম্প্রতি ব্রিটিশ জার্নাল অব অপথালমোলজি-তে প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আটজন রোগীর ফলাফল। তাতে দেখা যায়, আটজন রোগীর মধ্যে সাতজনই ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।
গবেষকেরা আশা করছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন— কারা এই চিকিৎসা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারবেন।
