ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল ভাণ্ডারের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বিশ্বজুড়ে জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সেই সাথে আমেরিকার জন্যও ডেকে আনছে ‘মহাবিপদ’। দেশটির মাটির নিচে থাকা প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেলের মজুত মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে উত্তোলন করার যে পরিকল্পনা ট্রাম্প সাজাচ্ছেন, তা পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠতে পারে। ভেনেজুয়েলার এই তেল কেবল পরিমাণের দিক থেকেই বিশাল নয় বরং এটি বিশ্বের অন্যতম ‘নোংরা’ বা দূষিত তেল হিসেবে পরিচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার থাকা এই তেল মূলত ‘হেভি সোর ক্রুড’, যা ঘনত্বের দিক থেকে অনেকটা চিটাগুড়ের মতো। এটি উত্তোলন করা অত্যন্ত কঠিন এবং ব্যয়বহুল। এই তেল মাটির নিচ থেকে বের করতে হলে প্রচুর পরিমাণে বাষ্প ব্যবহার করে উত্তপ্ত করতে হয়। এটা করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়াতে হয়। ফলে উত্তোলনের শুরু থেকেই পরিবেশে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে। শুধু উত্তোলনই নয়, এই তেলে সালফারের মাত্রা অতিরিক্ত হওয়ায় এটি শোধনের প্রক্রিয়াও সাধারণ তেলের তুলনায় অনেক বেশি দূষণকারী।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলনের অবকাঠামো অত্যন্ত জরাজীর্ণ এবং পুরনো। ফলে সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস লিক হয় এবং অতিরিক্ত গ্যাস পুড়িয়ে ফেলার কারণে বায়ুমণ্ডলে বিষাক্ত ধোঁয়া মেশে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, ভেনেজুয়েলায় মিথেন নিঃসরণের হার বিশ্ব গড়ের চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি। যদিও মার্কিন কোম্পানিগুলো তাদের উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এই দূষণ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করতে পারে, তবে তেলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সেই দূষণ নিয়ন্ত্রণ করার একটা নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পরিবেশগত বিপর্যয়ের পাশাপাশি এখানে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা এবং বিনিয়োগের অভাবে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বর্তমানে তলানিতে ঠেকেছে। ধ্বংসপ্রায় এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে আগামী ১৫ বছরে অন্তত ১৮৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। যখন সারা বিশ্ব ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে এবং তেলের বাজারে মন্দাভাব বিরাজ করছে, তখন এতো বিপুল অর্থ খরচ করে উচ্চ-নিঃসরণকারী এই তেল উত্তোলন কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।
জলবায়ু বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ সরাসরি কার্বন নিঃসরণ বাড়ানোর চেয়েও বেশি ক্ষতি করবে বিশ্বব্যাপী চলমান পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনকে। এটি দেশগুলোর মধ্যে বিংশ শতাব্দীর মতো সম্পদ নিয়ে সংঘাতের মানসিকতাকে আবার চাঙ্গা করে তুলবে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের যে বৈশ্বিক লক্ষ্য রয়েছে, তাকে বাধাগ্রস্ত করবে। শেষ পর্যন্ত এই তেলের লড়াই পৃথিবীকে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা এবং গভীর জলবায়ু সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
