প্রকৃতির রহস্যময় ভাণ্ডারে মধুর অবস্থান সব সময়ই অমৃতের সমান। কিন্তু এক প্রকারের মধুর নাম শুনলেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে মৃত্যুর ভয়। একে বলা হয় ‘ম্যাড হানি’ বা পাগলা মধু। যা আসলে মধুর ছদ্মবেশে এক ভয়ংকর গরল। মাত্র এক চামচ পরিমাণ এই মধু শরীরে প্রবেশ করলে যেকোনো সুস্থ মানুষ উন্মাদ হয়ে যেতে পারেন, এমনকি স্নায়ু অবশ হয়ে দেখা দিতে পারে প্রাণসংশয়। গাঢ় লালচে রঙের এই আকর্ষণীয় মধু বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে পরিচিত, যার নেপথ্যে রয়েছে গ্রায়ানোটক্সিন নামক একধরনের শক্তিশালী বিষ।
এই অদ্ভুত মধুর উৎস পৃথিবীর মাত্র দুটি দুর্গম অঞ্চলে; একটি নেপালের হিমালয়ের তিন হাজার মিটার উচ্চতায় এবং অন্যটি তুরস্কের কৃষ্ণসাগর উপকূলে। মূলত রডোডেনড্রন ফুলের নেক্টার থেকে মৌমাছিরা এই মধু সংগ্রহ করে, আর সেই ফুলের বিষাক্ত উপাদানই মধুকে করে তোলে নেশাগ্রস্ত ও প্রাণঘাতী। এর স্বাদ সাধারণ মধুর মতো মিষ্টি হলেও গলার নিচে নামতেই একধরনের তীব্র তিক্ততা অনুভূত হয়। গ্রায়ানোটক্সিন সরাসরি মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ওপর আঘাত হানে। ফলে রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন দ্রুত কমে যায়, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে এবং পেশিতে পক্ষাঘাত দেখা দিতে পারে।
ইতিহাসের পাতায় এই মধু আস্ত এক সৈন্যদলকে পরাজিত করার অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে গ্রিক যোদ্ধা জেনোফোনের সৈন্যরা এবং পরবর্তীতে ৬৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান সৈন্যরা এই মধু খেয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে কুপোকাত হয়েছিলেন। শত্রুপক্ষ কৌশলে তাদের পথে মধুর পাত্র সাজিয়ে রেখেছিল, যা খেয়ে সৈন্যরা হ্যালুসিনেশন ও শারীরিক অসুস্থতায় অচেতন হয়ে পড়লে তাদের সহজে পরাজিত করা হয়।
বর্তমানে নেপালের গুরুঙ্গ উপজাতির মানুষ নিজেদের জীবন বাজি রেখে পাহাড়ের খাড়া ঢালে কাঠের মই বেয়ে এই মধু সংগ্রহ করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে গ্রায়ানোটক্সিন নির্দিষ্ট মাত্রায় ড্রাগ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও স্থানীয়রা একে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভেষজ ওষুধ ও নেশার বস্তু হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
নেপালে বছরে দু’বার এই মধু সংগ্রহ করা হয় এবং বিশ্ববাজারে এর আকাশচুম্বী চাহিদা ও দাম রয়েছে। তুরস্কের মৌমাছি পালনকারীরা মধুর ঘনত্ব বা প্রোমিলের ওপর ভিত্তি করে এর গুণমান নির্ধারণ করেন। যদিও সঠিক চিকিৎসায় এই বিষক্রিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব, তবুও আগাম সতর্কতা ছাড়া এই মধুর স্বাদ নেওয়া হতে পারে জীবনের শেষ ভুল।
