নতুন করে উন্মোচিত হওয়া ব্রিটিশ সরকারি নথিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাকি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্রিটিশ সেনাদের বেসামরিক আদালতে বিচার ঠেকাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার কর্মকর্তাদের ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ করেছিলেন।
সম্প্রতি লন্ডনের কিউতে অবস্থিত ন্যাশনাল আর্কাইভসে জমা হওয়া প্রায় ৬০০টি গোপন নথি থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। পাবলিক রেকর্ডস অ্যাক্ট অনুযায়ী ২০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর এসব নথি জনসমক্ষে আনা হয়েছে।
প্রকাশিত নথিপত্র অনুসারে, ২০০৫ সালে টনি ব্লেয়ার তার তৎকালীন বৈদেশিক বিষয়ক ব্যক্তিগত সচিব অ্যান্টনি ফিলিপসনকে একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি জানিয়েছিলেন, ইরাকে ব্রিটিশ সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা অন্য কোনো বেসামরিক আদালত যেন তদন্ত করতে না পারে সেটি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
ব্লেয়ারের মতে, ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে ওঠা নির্যাতনের অভিযোগগুলো বেসামরিক আদালতের পরিবর্তে সামরিক আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি ছিল। বিশেষ করে ২০০৩ সালে বসরায় ইরাকি হোটেল রিসেপশনিস্ট বাহা মুসার মৃত্যুর ঘটনাটি নিয়ে ব্লেয়ার অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন। ফিলিপসন যখন তাকে জানিয়েছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল চাইলে মামলাটি বেসামরিক আদালতে পাঠাতে পারেন, তখন ব্লেয়ার স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন কোনোভাবেই তা করা যাবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্লেয়ার আশঙ্কা করেছিলেন ব্রিটিশ সেনাদের বেসামরিক বা আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করা হলে দেশে এবং বিদেশে ইরাক যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হবে।
ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্রিস্টোফার ফেদারস্টোন মনে করেন, ব্লেয়ার আন্তর্জাতিক আইন বা বেসামরিক বিচার ব্যবস্থার চেয়ে সামরিক বিচারকেই বেশি পছন্দ করতেন কারণ সেখানে শাস্তি সাধারণত কম কঠোর হয়। এছাড়া ব্রিটিশ সেনাবাহিনী কার্যকরভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করতে পারছে না এমন কোনো ধারণা যাতে জনমনে তৈরি না হয় সে বিষয়েও তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন।
ইরাক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালে মূলত গণবিধ্বংসী অস্ত্রের উপস্থিতির অজুহাতে যা পরবর্তীতে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। চিলকট রিপোর্টের মতো বিভিন্ন তদন্তে ইরাকে ব্রিটেনের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করা হলেও ব্লেয়ার সবসময় তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তবে নতুন প্রকাশিত এই নথিগুলো প্রমাণ করছে, বিচারের হাত থেকে নিজ দেশের সেনাদের রক্ষা করতে ব্লেয়ার প্রশাসন পর্দার আড়ালে কতটা সক্রিয় ছিল। যদিও ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে তদন্ত বন্ধ করে দেয়। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলো বরাবরই অভিযোগ করে আসছে যে ব্রিটেন সরকার এই তদন্ত প্রক্রিয়াকে কৌশলে বাধাগ্রস্ত করেছে।
এই নথিগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর ব্রিটেনের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আইনের শাসন বজায় রাখার যে দাবি ব্রিটেন করে থাকে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এমন হস্তক্ষেপ সেই অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
