এক জন মানুষের নামের পাশে ৩৮৯ জন ভোটারকে সন্তান হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। একই ব্যক্তিকে পিতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ওই ৩৮৯ জন। বাস্তবে ও বৈজ্ঞানিক দিক থেকে এমন ঘটনা অসম্ভব বলেই মনে করছে নির্বাচন কমিশন।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় এই অস্বাভাবিক তথ্য উঠে এসেছে। রাজ্যের এসআইআর মামলা নিয়ে সুপ্রিমকোর্টে হলফনামা জমা দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে নির্বাচন কমিশন।
আগামী বুধবার সুপ্রিমকোর্টে পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর সংক্রান্ত মামলার শুনানি রয়েছে। তার আগে কেন বিপুল সংখ্যক ভোটারকে শুনানির জন্য ডেকে পাঠানো হয়েছে তার ব্যাখ্যা দিতে শীর্ষ আদালতে হলফনামা জমা দেয় কমিশন। সেই হলফনামাতেই উঠে এসেছে ভোটার তালিকার একাধিক গুরুতর অসঙ্গতির কথা। নথি অনুযায়ী বীরভূম জেলার নানুর বিধানসভা এলাকায় এক জন ভোটারের সঙ্গে ৩৮৯ ভোটারকে সন্তান হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। ওই সব ভোটার একই ব্যক্তিকে নিজের পিতা হিসেবে নথিভুক্ত করেছেন। কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এক জন মানুষের এত সন্তান থাকা বাস্তবে অসম্ভব। শুধু বীরভূম নয় রাজ্যের আরও একাধিক জেলায় একই ধরনের অস্বাভাবিক তথ্য মিলেছে। হাওড়ার সাঁকরাইলে এক জনকে অভিভাবক হিসেবে দেখানো হয়েছে ৩১০ ভোটারের ক্ষেত্রে। মুর্শিদাবাদে ১৯৯ জন দার্জিলিঙে ১৫২ জন জলপাইগুড়ির নাগরাকাটায় ১২০ জন এবং আসানসোলে ১৭০ ভোটার একই ব্যক্তিকে নিজের অভিভাবক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের মতে, এই সব তথ্য বাস্তব এবং বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব। কমিশনের ভাষায় এমন অসঙ্গতি ভোটার তালিকায় বড়সড় গরমিল অথবা তথ্যগত ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়। তাই এই সব ক্ষেত্রে আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।
হলফনামায় কমিশন জানিয়েছে, দার্জিলিং আসানসোল মেমারি বীরভূমের নানুর মুর্শিদাবাদ কান্দি জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা ও ক্রান্তি পূর্ব মেদিনীপুরের মুগবেড়িয়া এবং হাওড়ার সাঁকরাইল এলাকায় এই ধরনের ঘটনা বেশি সংখ্যায় ধরা পড়েছে।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ছয় জনের বেশি সন্তানের ঘটনা পাওয়া গিয়েছে দুই লাখ ছয় হাজারেরও বেশি ক্ষেত্রে। ১০ জনের বেশি সন্তানের তথ্য মিলেছে আট হাজার ৬৮২ ভোটারের নথিতে। আরও উদ্বেগজনক ভাবে ৫০ জনের বেশি সন্তানের ঘটনা ধরা পড়েছে ১০টি ক্ষেত্রে এবং একশ জনের বেশি সন্তানের ঘটনা পাওয়া গিয়েছে সাতটি ক্ষেত্রে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হল দুটি ক্ষেত্রে এক জন ভোটারের সঙ্গে দুইশোর বেশি ভোটার যুক্ত থাকার তথ্য মিলেছে।
কমিশনের মতে, এই সব তথ্য ভোটার তালিকায় লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি বা তথ্যগত অসঙ্গতির স্পষ্ট প্রমাণ। এই কারণেই যেখানে ছয় জন বা তার বেশি ভোটার একজন ব্যক্তির সঙ্গে সন্তান বা প্রজেনি হিসেবে যুক্ত সেখানে সংশ্লিষ্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের মাধ্যমে নোটিস জারি করে শুনানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কমিশন সূত্রে খবর, এখনও পর্যন্ত আনম্যাপড এবং তথ্যগত অসঙ্গতি থাকা এক কোটি ৫১ লাখের বেশি ভোটারের শুনানির নোটিস জেনারেট করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয় জনের বেশি সন্তান সংক্রান্ত অসঙ্গতির কারণে প্রায় ২০ লাখ ভোটারকে শুনানিতে ডাকা হয়েছে।এই প্রেক্ষাপটেই পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর পরিস্থিতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার আগেই তৃণমূলের পক্ষ থেকে সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেন আলাদা করে মামলা করেছিলেন।
আগামীকাল বুধবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা। নির্বাচন কমিশনের জমা দেওয়া হলফনামার পর এই শুনানি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
ভোটার তালিকার এই বিপুল অসঙ্গতি রাজ্যের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন সুপ্রিমকোর্টের পর্যবেক্ষণ এবং নির্দেশের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে প্রশাসন এবং রাজনৈতিক মহল
