ভারতের উত্তর প্রদেশের বান্দা জেলায় তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, দিনের কোন সময় তা বুঝা মুশকিল। সেখানকার বাসিন্দারা সকাল-দুপুর বা রাতের পার্থক্য করতে পারছেন না। তাদের ভাষ্য, সেখানে সব সময়ই যেন- দুপুরের তীব্র রোদ ও উত্তাপ বিরাজ করছে। জেলায় কয়েকদিন ধরে ৪৭ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড করা হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
ভোর ৬টার মধ্যেই সূর্যের তাপ দুপুরের মতো অনুভূত হচ্ছে, আর রাতেও তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকায় শরীর পর্যাপ্ত ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
তীব্র এই গরমে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, পরিবহন শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। অধিকাংশ বাজার এখন ভোরেই শুরু হয়ে সকাল ৮টা–৯টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এরপর দুপুরের আগেই শহর ও গ্রামাঞ্চল কার্যত ফাঁকা হয়ে পড়ছে।
নির্মাণ শ্রমিকদের অনেকে জানান, তারা ভোরে কাজ শুরু করে দুপুর পর্যন্ত কাজ করেন, তারপর দুপুরের তীব্র তাপ এড়াতে কয়েক ঘণ্টা বিরতি নেন এবং বিকেলে আবার কাজ শুরু করেন। তবে এই বিরতির কারণে তাদের দিন ১২-১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে, যদিও আয়ের ক্ষেত্রে কোনো বাড়তি সুবিধা মিলছে না।
তীব্র গরমের কারণে কৃষিপণ্যও দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা খুব ভোরে বাজারে এসে দ্রুত পণ্য বিক্রি করে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সকাল ৮টার পর থেকেই অনেক বাজারে কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্যখাতেও। স্থানীয় হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হিটস্ট্রোক, ডায়রিয়া, বমি, জ্বর এবং পানিশূন্যতার রোগী প্রতিদিন বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। দিনে গড়ে ১৫-২০ জন তাপজনিত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং পরিবেশগত পরিবর্তন তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বান্দা জেলা কর্ণক্ষেত্র অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে গ্রীষ্মকালে সূর্যের তাপ সরাসরি ও দীর্ঘ সময় পড়ে। এর পাশাপাশি নদী ও জলাশয়ের পানি কমে যাওয়া, বনভূমি হ্রাস এবং বালু ও পাথর উত্তোলনের মতো কার্যক্রম তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এখন গরম শুধু মৌসুমি বিষয় নয়, বরং স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। একজন প্রবীণ বাসিন্দা মন্তব্য করেন, ‘সকাল আর রাতের পার্থক্য এখন আর বোঝা যায় না। সব সময়ই যেন দুপুর।’
তীব্র এই তাপপ্রবাহে শুধু মানুষ নয়, পশুপাখি ও পরিবেশও বিপর্যস্ত। অনেক গ্রামে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। একটি মাত্র কূপের ওপর নির্ভর করে কয়েকশো মানুষকে দৈনন্দিন পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ বিভ্রাটও পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে। অনেকেই ফ্যান বা কুলারের ওপর নির্ভর করতে পারলেও নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় স্বস্তি মিলছে না।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী বছরগুলোতে এই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ আরও বাড়তে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।
এদিকে কয়েকদিন পর বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের কারণে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও স্বস্তি সাময়িক বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয়দের জন্য এখন টিকে থাকাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
