ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সমর্থন দিয়ে একের পর এক নতুন বার্তা দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সর্বশেষ বার্তায় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের ফাঁসিতে ঝুলালে যুক্তরাষ্ট্র ‘অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ’ নেবে।
এর আগে এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, “ইরানি দেশপ্রেমিকরা, বিক্ষোভ চালিয়ে যান, আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিন। হত্যাকারী ও নির্যাতনকারীদের নাম সংরক্ষণ করুন। তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে। বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক আমি বাতিল করেছি।”
এদিকে, ইরানে বিক্ষোভ দমনে ভয়াবহ বলপ্রয়োগের প্রেক্ষাপটে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা ওয়াশিংটনে আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে দিয়ে অনিবার্য সিদ্ধান্তের দিকে নিজেকেই ঠেলে দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলে তেহরানের বিরুদ্ধে ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নেওয়া হবে। তবে এটি সরাসরি সামরিক হামলার ঘোষণা নয়, বিশ্লেষকদের মতে-প্রতীকী বা সীমিত কোনও অভিযান ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই দুর্বল করে দিতে পারে।
সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সিআইএ পরিচালক লিয়ন পানেটা সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানি জনগণকে বলেছেন-সহায়তা আসছে। এখন কিছু না করলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে।” তার মতে, এটি পূর্ণমাত্রা বা সর্বাত্মক যুদ্ধ নাও হতে পারে, তবে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ জরুরি।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও চাপ বাড়ছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট নয়। ট্রাম্পের বারবার দেওয়া হুঁশিয়ারি বিক্ষোভকারীদের মধ্যেও প্রত্যাশা তৈরি করেছে- তারা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অন্তত একটি ‘ঢাল’ আশা করছে।
কৌশলগত দিক থেকেও ট্রাম্পের সামনে সুযোগ আছে বলে মনে করছেন অনেকে। অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইরান অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল, ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ঘিরে উত্তরাধিকার প্রশ্নও অনিশ্চিত। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত হওয়ায় দেশটির আঞ্চলিক প্রভাবও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবু ইতিহাস সতর্ক করছে। ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়া— সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ শুরুতে কিছুটা যুক্তিসংগত মনে হলেও পরিণতি হয়েছে জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী। প্রশ্ন উঠছে— মার্কিন হামলা কি সত্যিই ইরানি বিক্ষোভকারীদের রক্ষা করবে, নাকি উল্টোভাবে সরকারের দমননীতি আরও কঠোর করবে?
ইরানের মতো গভীর ইতিহাস ও শক্তিশালী জাতীয় পরিচয়ের দেশে বাইরে থেকে গণতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়া যে প্রায় অসম্ভব, তা স্বীকার করছেন বিশ্লেষকেরা। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন অনিশ্চয়তা এবং সংকট। মঙ্গলবার এক সাংবাদিকের প্রশ্নে তিনি বলেন, “এতে বিক্ষোভকারীরা রক্ষা পাবে কি না— আপনি কখনওই নিশ্চিত হতে পারেন না।” এই ‘আপনি কখনওই নিশ্চিত হতে পারবেন না’—এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে ইরান সংকটে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি।
