সরকারবিরোধী বিক্ষোভে টালমাটাল ইরান। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি। কিন্তু এত কিছুর পরও ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর এলিট ফোর্সের মধ্যে কোনো ভাঙনের লেশমাত্র দেখা যায়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, নানা সময় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে এলিট ফোর্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে এমনটি বলা হয়েছে।
এদিকে গতকাল খবর পাওয়া গেছে, ইরানে চলমান বিক্ষোভ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। রাস্তায় তেমন বিক্ষোভকারীদের দেখা যায়নি। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প একের পর এক হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে পাল্টা হুমকি দিয়েছে ইরানও। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে আক্রমণ করে, তা হলে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে টার্গেট করবে তেহরান। ইতোমধ্যে এ কথা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে জানিয়েও দিয়েছে তেহরান। ইরানি এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, বিক্ষোভে প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তিনি বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর জন্য সন্ত্রাসীদের দায়ী করেছেন। এর আগে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দেশটিতে চলমান বিক্ষোভে প্রায় ৬০০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে জানিয়েছে।
ইরানের কয়েক স্তরের নিরাপত্তা কাঠামোর কারণে অভ্যন্তরীণ ভাঙন ব্যতীত বাইরের চাপ দিয়ে দেশটিতে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন ইরানি-আমেরিকান শিক্ষাবিদ ও আঞ্চলিক সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর। তিনি বলেন, দেশটির কয়েক ধাপের নিরাপত্তা স্তরের মূলভিত্তি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনী বাসিজ। এই দুই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। তিনি বলেন, এ ধরনের কিছু সফল করতে হলে দীর্ঘসময় ধরে রাস্তায় মানুষের জমায়েত থাকতে হবে। আর রাষ্ট্রের ভাঙন ঘটাতে হবে। রাষ্ট্রের কিছু অংশ, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশকে দলত্যাগ করতে হবে।
ইরানের বিক্ষোভের বিষয়ে মন্তব্য জানতে জেনেভায় জাতিসংঘে ইরানি মিশন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং হোয়াইট হাউসের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
দেশটির ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি অতীতে একের পর এক অস্থিতিশীলতায়ও টিকে গেছেন। ২০০৯ সালের পর দেশটিতে পঞ্চম বৃহৎ আন্দোলন চলছে এবার। গভীর ও অমীমাংসিত অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখেও শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও সংহতির প্রমাণ এটি, বলেন মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পল সালেম। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইয়ার বলেন, পরিস্থিতি বদলাতে হলে, বিক্ষোভকারীদের এমন গতি তৈরি করতে হবে; যা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শক্তিশালী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় শাসনের প্রতি অনুগত বড় জনভিত্তি এবং ৯ কোটি জনসংখ্যার দেশটির ভৌগোলিক ও জনতাত্ত্বিক ব্যাপ্তি অতিক্রম করতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, টিকে থাকা মানেই স্থিতিশীলতা নয়। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ১৯৭৯ সালের পর থেকে সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জগুলোর একটির মুখোমুখি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতিকে শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছে, পুনরুদ্ধারের স্পষ্ট কোনও পথ নেই। কৌশলগতভাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ রয়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ নামে পরিচিত প্রক্সি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় মিত্রদের ভয়াবহ ক্ষতির ফলে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
নাসর বলেন, ইরান ‘পতনের মুহূর্তে’ পৌঁছেছে বলে মনে করেন না তিনি। তবে সামনে এগোনোর পথে দেশটি এখন ??অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা সরাসরি দেশটির ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর বিরোধিতায় রূপ নেয়। রাজনৈতিকভাবে সহিংস দমন-পীড়ন ইরানের অবশিষ্ট বৈধতাকে আরও ক্ষয় করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ বলেছে, ইরানের চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৫৭৩ জনের মৃত্যুর সত্যতা যাচাই করেছে তারা। এর মধ্যে ৫০৩ জন বিক্ষোভকারী ও ৬৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। সংগঠনটি বলেছে, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
