দীর্ঘ কয়েক দশকের সতর্কতা এবং নীতিগত অবস্থান ভেঙে অন্যায় সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেনিকে হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে পরিচালিত এই হামলায় খামেনেনির মৃত্যুর সংবাদে পুরো মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতিতে বড় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে যে আমূল পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, এই ঘটনা তারই একটি চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আধুনিক ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাকে সরাসরি এবং প্রকাশ্য অভিযানে হত্যা করল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার ভোরে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এই অভিযানের কথা ঘোষণা করেন। যদিও তিনি সরাসরি ‘হত্যাকাণ্ড’ শব্দটি ব্যবহার করেননি, তবে তিনি দাবি করেছেন যে ইরানের পক্ষ থেকে আসন্ন হুমকি মোকাবিলা করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে এক টেলিফোন আলাপে ট্রাম্প ব্যক্তিগত আক্রোশের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ইরান তাকে হত্যার চেষ্টা করার আগেই তিনি তাদের নেতাকে সরিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাকে হত্যার ইরানি ষড়যন্ত্রের গোয়েন্দা তথ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি এই অভিযানকে আত্মরক্ষামূলক বলে দাবি করেন।
ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের হত্যা করা থেকে বিরত থাকার দীর্ঘ ঐতিহ্য বজায় রেখেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মাধ্যমে নাৎসি নেতাদের বিচার করা কিংবা ইরাক ও লিবিয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় বিদ্রোহীদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত নেতাদের মৃত্যুর ঘটনা থাকলেও কোনো দেশের সর্বোচ্চ সার্বভৌম নেতাকে এভাবে লক্ষ্যবস্তু করার নজির ছিল না। এমনকি রোনাল্ড রিগ্যানের আমল থেকে কার্যকর থাকা একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে মার্কিন সরকারের যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকা আইনত নিষিদ্ধ ছিল। তবে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন এবং সাম্প্রতিক সুপ্রিম কোর্টের দায়মুক্তির রায়ের ফলে এই আইনি বাধাগুলো এখন শিথিল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন গত দুই মাসের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। এর ঠিক আগেই দক্ষিণ আমেরিকায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সরিয়ে তাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য নিউইয়র্কে আনা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দুটি দেশের সরকারকে এভাবে কার্যত ‘শিরশ্ছেদ’ করার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন এক নতুন ধরনের বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষক টিম নাফতালির মতে, যারা খামেনেনির শাসন নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন তারা হয়তো এই মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করবেন না, কিন্তু কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধানকে এভাবে সরিয়ে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী পরিণাম নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়।
এই গোপন অভিযানের পেছনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে তারা খামেনেনির দৈনন্দিন রুটিন, চলাফেরা এবং যোগাযোগের ওপর কড়া নজরদারি চালিয়ে আসছিল। তেহরানের একটি সরকারি কম্পাউন্ডে যখন শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা এক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন, তখনই সেই সুযোগটি গ্রহণ করা হয়। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সেই হামলায় ইরানের প্রেসিডেন্সি এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যালয়সহ পুরো কম্পাউন্ডটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলের আধুনিক প্রযুক্তির প্রজেক্টাইল এবং সিআইএ’র নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়েই এই অভিযান সফল হয়েছে বলে জানা গেছে।
অতীতের তাকালে দেখা যায়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এর আগে কিউবার ফিদেল কাস্ত্রোকে অন্তত আটবার হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল। সত্তর দশকের চার্চ কমিটির তদন্তে এই ধরনের গোপন হত্যাকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাবগুলো উঠে এসেছিল, যার ফলে মার্কিন প্রশাসন একসময় এ ধরনের কার্যক্রম থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল। তৎকালীন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা যুক্তি দিয়েছিলেন, কোনো বিদেশি নেতাকে সরিয়ে দিলে তার জায়গায় কে আসবে বা তার ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সব সময় অনিশ্চয়তা থাকে। ভিয়েতনামের এনগো ডিন দিয়েমের হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে অনেক অভিজ্ঞ কূটনীতিক এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্তের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
ওবামা প্রশাসনের সময় থেকে ড্রোনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী নেতাদের হত্যার যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে তা এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। ২০২০ সালে ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার মাধ্যমে যে ধারা শুরু হয়েছিল, খামেনেনির মৃত্যুর মাধ্যমে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাল। বর্তমান হোয়াইট হাউস মনে করছে, দীর্ঘ আলোচনার টেবিলে বসে সময় নষ্ট করার চেয়ে সরাসরি শক্তির প্রয়োগই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে দিতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে এই ঘটনাটি ঘটল, তাতে এই অঞ্চলে একটি অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের শঙ্কা আগের চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে গেছে।
তেহরানের রাস্তায় এখন শোকাতুর মানুষের ভিড় এবং বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নতুন ক্ষমতার জানান দিচ্ছে। কংগ্রেসের অনুমোদন বা আন্তর্জাতিক মহলের তোয়াক্কা না করেই ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে বিশ্ব কূটনীতির ধরন পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। খামেনেনি পরবর্তী ইরানে কারা ক্ষমতায় আসবে এবং মার্কিন জ্বালানি স্বার্থের ওপর এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আপাতদৃষ্টিতে এই অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক জয় হিসেবে দেখা হলেও, এর দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও মানবিক মূল্য কতটুকু হবে, তা কেবল সময়ই বলে দেবে।
