বিশ্বজুড়ে চলছে সামরিক সংঘাত ও উত্তেজনা। ইউক্রেন থেকে শুরু মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত, যেন অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়েছে এসব অঞ্চল। এসব উত্তেজনার জেরে গোটা বিশ্বেই বেড়েছে সামরিক শক্তি বাড়ানোর এক অলিখিত প্রতিযোগিতা। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে একটি আন্তর্জাতিক অস্ত্র পর্যবেক্ষণ গোষ্ঠী। মূলত ইউরোপ ও এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর ফুলেফেঁপে ওঠা সামরিক বাজেটই বিশ্বজুড়ে ব্যয়ের এই লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতির প্রধান কারণ।
সুইডেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা সংক্ষেপে সিপ্রি (এসআইপিআরআই)-এর প্রকাশিত ‘ট্রেন্ডস ইন ওয়ার্ল্ড মিলিটারি এক্সপেন্ডিচার’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের দেশগুলো আগের বছরের (২০২৪) তুলনায় এক ধাক্কায় ১৪ শতাংশ সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে। গত বছর এই খাতে তাদের মোট খরচ ছিল ৮৬৪ বিলিয়ন বা ৮৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে, এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলে ব্যয়ের এই হার বেড়েছে ৮.১ শতাংশ, যার ফলে ওই অঞ্চলে মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ৬৮১ বিলিয়ন ডলার।
সার্বিকভাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক কর্মসূচির পেছনে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২.৯ ট্রিলিয়ন বা ২ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি ডলার। এটি আগের বছরের তুলনায় ২.৯ শতাংশ বেশি। সিপ্রি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ ব্যয় বিশ্ব অর্থনীতির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির আড়াই শতাংশ, যা গত ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড।
বিশ্বে সামরিক খাতে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢালা প্রথম পাঁচটি দেশের শীর্ষেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপরই যথাক্রমে অবস্থান করছে চীন, রাশিয়া, জার্মানি ও ভারত। এই পাঁচটি দেশ মিলে পুরো বিশ্বের সামরিক ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৫৮ শতাংশ) নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে।
সিপ্রি’র প্রতিবেদনে একটি ভিন্নদিকও ফুটে উঠেছে। বলা হয়েছে, সার্বিক খরচ ঊর্ধ্বমুখী হলেও ২০২৪ সালের ৯.৭ শতাংশ বৃদ্ধির তুলনায় এই বছর ব্যয়ের হার কিছুটা কমেছে। এই সামান্য পতনের একটি বড় কারণ হলো-যুক্তরাষ্ট্র গত বছর ইউক্রেনকে অস্ত্র সহায়তার জন্য নতুন করে কোনও বড় বাজেট পাস করেনি। (সিপ্রি সাধারণত এই ধরনের সামরিক সহায়তাগুলো দাতা দেশের খাতার হিসাব হিসেবেই গণনা করে।)
পরিসংখ্যানে যদি যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবটুকু আলাদা করে রাখা হয়, তবে বিশ্বে প্রতিরক্ষা ব্যয় লাফিয়ে ৯.২ শতাংশ বেড়েছে। তারপরও সামরিক খাতে খরচের দৌড়ে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রই। ২০২৫ সালে তারা একাই ৯৫৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এরপর ৩৩৬ বিলিয়ন ডলার নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন এবং প্রায় ১৯০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে তৃতীয় স্থানে আছে রাশিয়া।
আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এবার বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের এই বিরাট উল্লম্ফনের নেপথ্যে রয়েছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে বিশ্ব সমীকরণে কিছু নতুন পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সিপ্রি’র গবেষক জেড গুইবারতো রিকার্ড বলেন, “২০২৫ সালে ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সামরিক ব্যয় ১৯৫৩ সালের পর সবচেয়ে দ্রুত হারে বেড়েছে। একদিকে ইউরোপ সামরিক দিক দিয়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে জোটের খরচের বোঝা ভাগাভাগি করার জন্য ওয়াশিংটনের দিক থেকেও প্রচণ্ড চাপ বাড়ছে।”
এর ফলেই দেশগুলোর সামরিক ব্যয়ের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যাদের সামরিক ব্যয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে- বেলজিয়াম (৫৯%), স্পেন (৫০%), নরওয়ে (৪৯%), ডেনমার্ক (৪৬%), জার্মানি (২৪%), পোল্যান্ড (২৩%) এবং কানাডা (২৩%)।
জার্মানি সামরিক খাতে ১১৪ বিলিয়ন ডলার ঢেলে খরচের দিক থেকে বিশ্ব তালিকায় সরাসরি চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এশিয়ায় জাপানের সামরিক ব্যয় ৯.৭ শতাংশ বেড়ে ৬২.২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আর জিডিপির হিসাবে জাপানের প্রতিরক্ষা ব্যয় এখন ১.৪ শতাংশ, যা ১৯৫৮ সালের পর দেশটিতে সর্বোচ্চ।
সিপ্রি’র জ্যেষ্ঠ গবেষক ডিয়েগো লোপেজ দা সিলভা বলেন, “এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ফিলিপাইনের মতো মার্কিন মিত্ররা নিজেদের সামরিক বাহিনীর জন্য এখন অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করছে। শুধু দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক উত্তেজনা নয়, বরং প্রয়োজনে আমেরিকার সাহায্য পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাই তাদের এমন সিদ্ধান্তে বাধ্য করছে।”
একই সময়ে গণতান্ত্রিক ও স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ান নিজেদের সামরিক ব্যয় ১৪.২ শতাংশ বাড়িয়ে ১৮.২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে, যা তাদের জিডিপির ২.১%। সিপ্রির হিসাব বলছে, ১৯৮৮ সালের পর এটিই তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক উল্লম্ফন।
অন্যদিকে, সামরিক খাতে চীনের ব্যয় গত বছর ৭.৪ শতাংশ বেড়েছে। গত এক দশকের মধ্যে এটাই তাদের সবচেয়ে বেশি ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনা। এর মাধ্যমে টানা ৩১ বছর ধরে সামরিক খাতে চীনের ব্যয় বাড়ল। ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি আধুনিক করার যে লক্ষ্য বেইজিং নির্ধারণ করেছে, তারই অংশ হিসেবে এই বাজেট বাড়ানো হচ্ছে।
যদি জিডিপির অনুপাতে চিন্তা করা হয়, তবে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সামরিক ব্যয় করে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। তারা তাদের জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশই ঢেলে দিচ্ছে সামরিক খাতে! রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চার বছর ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়া কিয়েভ সামরিক খরচের দিক থেকে বৈশ্বিক তালিকায় সপ্তম স্থানে রয়েছে।
এর বিপরীতে রাশিয়া তাদের জিডিপির ৭.৫ শতাংশ সামরিক খাতে খরচ করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৫.৯ শতাংশ বেশি।
সিপ্রি’র আরেক গবেষক লরেঞ্জো স্ক্যারাজ্জাতো জানিয়েছেন, “২০২৫ সালে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মোট সরকারি খরচের এক বিশাল অংশ চলে গেছে সামরিক খাতে, যা এর আগে কখনওই দেখা যায়নি।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ চললে ২০২৬ সালেও দেশ দুটির সামরিক খরচ বাড়বে। কারণ একদিকে রাশিয়ার তেলের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও ইউক্রেনকে বড় অঙ্কের ঋণ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে খরচের দৌড়ে সবার আগে রয়েছে সৌদি আরব। তাদের সামরিক ব্যয় গত বছরের চেয়ে ১.৪ শতাংশ বেড়ে ৮৩.২ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। এর ঠিক পরেই রয়েছে ইসরায়েল। তারা খরচ করেছে ৪৮.৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪.৯ শতাংশ কম। গত বছর জানুয়ারিতে হামাসের সঙ্গে গাজা উপত্যকায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির কারণে ওই অঞ্চলে সংঘর্ষ কিছুটা কমে আসায় ইসরায়েলের খরচ কমে যায়।
ইরানের সামরিক ব্যয় সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৫.৬ শতাংশ কমেছে। কিন্তু সিপ্রি’র প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। দেশে ৪২ শতাংশের আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি হিসাবের বাইরে বিক্রি হওয়া তেলের টাকা ধরলে, তেহরানের প্রকৃত সামরিক ব্যয় আসলে আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
সিপ্রি’র গবেষক জুবাইদা করিম বলেন, “সরকারি পরিসংখ্যানে ইরানের প্রকৃত সামরিক ব্যয়ের হিসাব লুকিয়ে রাখাটাই স্বাভাবিক। তারা সরকারি বাজেটের বাইরে লুকিয়ে তেল বিক্রির অর্থ দিয়েই মূলত ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের বড় খরচ মেটায়।”
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সামরিক ব্যয় ৮.৯ শতাংশ বেড়ে ৯২.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধই এর অন্যতম প্রধান কারণ। ব্যয়ের দিক থেকে পাকিস্তানের চেয়ে ভারত অন্তত ৮০ বিলিয়ন ডলার এগিয়ে থেকে বিশ্বে পঞ্চম স্থানে রয়েছে।
আফ্রিকা মহাদেশের সামরিক ব্যয় ৮.৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮.২ বিলিয়ন ডলারে। পুরো আফ্রিকার এই ব্যয়কে যদি একটি দেশের হিসেবে ধরা হতো, তবে বিশ্বের তালিকায় তা জাপানের পর এবং ইসরায়েলের ঠিক আগে, অর্থাৎ ১১তম স্থানে থাকত। মহাদেশটির দেশগুলোর মধ্যে আলজেরিয়া সবচেয়ে বেশি সামরিক ব্যয় করে থাকে।
সিপ্রি ধারণা করছে, ২০২৬ সাল এবং এরপরও সামরিক খাতে ব্যয়ের এই জোয়ার থামবে না। সিপ্রি’র গবেষক জিয়াও লিয়াং বলেন, “বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে অস্থিরতা চলছে এবং বিভিন্ন দেশের যে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক পরিকল্পনা রয়েছে, তাতে করে আগামী দিনগুলোতেও সামরিক বাজেট বাড়তেই থাকবে।”
সামনে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির এই মিছিলে প্রধান ইন্ধন জোগাবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই। কারণ মার্কিন কংগ্রেস এরই মধ্যে ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা খাতের জন্য ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি বাজেট পাস করে রেখেছে। এর বাইরে ইরানের সঙ্গে চলা প্রায় তিন মাসের যুদ্ধে ওয়াশিংটনের পকেট থেকে প্রতিদিন গড়ে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে। সব ছাপিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৭ সালের প্রতিরক্ষা বাজেটের জন্য ১.৫ ট্রিলিয়ন বা দেড় লাখ কোটি ডলারের বিশাল অঙ্ক প্রস্তাব করারও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
