মেক্সিকোয় কুখ্যাত মাদক সম্রাট নেমেসিও রুবেন ওসেগুয়েরা সার্ভান্তেস বা ‘এল মেনচোকে’ হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনার পর দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় জালিস্কো অঙ্গরাজ্যসহ একাধিক এলাকায় আগুন, সড়ক অবরোধ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) কাতারের সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর দিয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সহায়তা ছিল। এতে এল মেনচোর জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের (সিজেএনজি) চার সদস্য নিহত হন। আরও দুজনকে মেক্সিকো সিটিতে স্থানান্তরের সময় মৃত্যু হয়।
খবরে আরও বলা হয়, এল মেনচো ও তার দলকে পাকড়াও করতে নিরাপত্তা বাহিনী যে অভিযান চালিয়েছিল, সেটির পর থেকেই জালিস্কো, কলিমা, মিচোয়াকান, নায়ারিত, গুয়ানাহুয়াতো ও তামাউলিপাস অঙ্গরাজ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং মহাসড়ক অবরোধ করে।
জালিস্কোর রাজধানী গুয়াদালাহারা রোববার রাত থেকে জনশূন্য হয়ে পড়ে। গুয়াদালাহারায় আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপের কয়েকটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। জালিস্কোর গভর্নর পাবলো লেমুস বাসিন্দাদের ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে গণপরিবহন স্থগিত করেছেন।
পর্যটন নগরী পুয়ের্তো ভালার্তায়ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সোমবার স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এল মেনচোকে হত্যার ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তাদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, দেশের সব অঙ্গরাজ্যের সরকারের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রয়েছে এবং অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছে।
বড় সাফল্য না নতুন সংকট?
৫৯ বছর বয়সী এল মেনচো ছিলেন মেক্সিকোর সবচেয়ে প্রভাবশালী মাদক সম্রাটদের একজন। সিনালোয়া কার্টেলের প্রতিষ্ঠাতা হোয়াকিন ‘এল চাপো’ গুজমান ও ইসমাইল জামবাদা গ্রেপ্তারের পর এটিই সবচেয়ে বড় অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশটিতে। এল চাপো ও জামবাদা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে আছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ এই অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে এল মেনচোকে ‘সবচেয়ে রক্তপিপাসু ও নির্মম মাদক সম্রাটদের একজন’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এটি মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও পুরো অঞ্চলের জন্য বড় অগ্রগতি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জালিস্কো, তামাউলিপাস, মিচোয়াকান, গুয়েরেরো ও নুয়েভো লিওন অঙ্গরাজ্যে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের ঘটনায় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। কানাডাও এসব এলাকায় ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। পুয়ের্তো ভালার্তায় অবস্থানরত নাগরিকদের আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এয়ার কানাডা পুয়ের্তো ভালার্তায় ফ্লাইট স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ও আমেরিকান এয়ারলাইন্সও পুয়ের্তো ভালার্তা ও গুয়াদালাহারায় ফ্লাইট বাতিল করেছে।
এল মেনচো ও সিজেএনজি
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও অ্যাভোকাডো চাষি এল মেনচো ২০০৭ সালের দিকে সিজেএনজি গঠন করেন। মার্কিন ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের মতে, এটি বর্তমানে মেক্সিকোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাদক পাচারকারী সংগঠন, যা কোকেন, হেরোইন, মেথামফেটামিন ও ফেন্টানিল যুক্তরাষ্ট্রে পাচারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
দীর্ঘদিন ধরেই তিনি গোপনে চলাফেরা করতেন। তার প্রচলিত ছবিগুলোও বহু পুরোনো।
বিশ্লেষকদের মতে, এল মেনচোর মৃত্যুকে প্রেসিডেন্ট শেইনবাউমের সরকারের বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও এটি নতুন সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তার সুস্পষ্ট উত্তরসূরি নেই। তার ভাই ও ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে কারাগারে, মেয়েও বন্দি। ফলে কার্টেলের আঞ্চলিক নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে। অতীতে এল চাপো গ্রেপ্তারের পর সিনালোয়া কার্টেলে এমন বিভক্তি দেখা গিয়েছিল।
বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতির মধ্যেই এ পরিস্থিতি মেক্সিকোর জন্য স্পর্শকাতর সময় তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে কার্টেলের অবকাঠামো, অর্থপাচার নেটওয়ার্ক ও সশস্ত্র শাখাকে দুর্বল করা না গেলে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা মাইক ভিজিল বলেন, শুধু শীর্ষ নেতাকে হত্যা বা গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত ও কার্যকরভাবে পুরো কাঠামো ভেঙে ফেলতে হবে। না হলে সহিংসতার বড় মূল্য দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মেক্সিকোয় প্রবেশ করছে, অথচ দেশটিতে বৈধ অস্ত্র বিক্রির একমাত্র সামরিক নিয়ন্ত্রিত দোকানে বছরে মাত্র সাড়ে ছয় হাজার অস্ত্র বিক্রি হয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে মাদকের চাহিদা কমাতে কার্যকর উদ্যোগেরও ঘাটতি রয়েছে।
ভিজিলের ভাষায়, চাহিদা না থাকলে কার্টেলও থাকবে না। এটি বড় সমস্যা। কিন্তু মাদক শিক্ষা বা আসক্তি নিরাময়ে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
