বর্তমান ব্যস্ত জীবনে খাদ্যাভ্যাসে অনিয়ম আর গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভোগেন না এমন মানুষ কমই আছেন। তবে আধুনিক পুষ্টিবিদ ও আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্য ফেরাতে এক প্রাচীন ঘরোয়া টোটকার ওপর জোর দিচ্ছেন- আর তা হলো প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক চামচ ‘ঘি’।
চিকিৎসকদের মতে, ঘি শুধুমাত্র খাবারের স্বাদ বাড়ায় না, এটি শরীরের জন্য একটি সুপারফুড হিসেবে কাজ করে।
জেনে নেওয়া যাক নিয়মিত সকালে ঘি খেলে শরীরে কী কী ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে:-
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘি নির্দিষ্ট কিছু উপাদানের একটি উৎস যা পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলে কিছু শারীরিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে, এটিকে রোগ নিরাময়ের নতুন উপায় হিসেবে বিবেচনা করার আগে সতর্ক থাকা জরুরি।
হজমে সহায়তা: সকালে খালি পেটে ঘি খেলে হজমে সাহায্যকারী এনজাইমগুলির নিঃসরণ উদ্দীপিত হতে পারে, যা খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে। এটি অন্ত্রের গতিশীলতা বৃদ্ধি করে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা লাঘবে সহায়ক হতে পারে।
ওজন ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য ভূমিকা: ঘিতে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট (monounsaturated এবং saturated fatty acids) শরীরের বিপাক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাঝারি চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড (Medium-Chain Fatty Acids), যা ঘিতে উপস্থিত থাকে, শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করতে পারে। তবে, ওজন কমানোর জন্য শুধু ঘি খাওয়া যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি সুষম খাদ্য এবং নিয়মিত ব্যায়াম।
ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্যের উন্নতি: ঘি শরীরের ভেতর থেকে আর্দ্রতা প্রদানে সহায়ক হতে পারে। এতে থাকা ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে ত্বক ও চুলের পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করতে পারে, যার ফলে ত্বক মসৃণ এবং চুল স্বাস্থ্যোজ্জ্বল দেখায়।
জয়েন্টের কার্যকারিতা: ঘিতে থাকা কিছু ফ্যাটি অ্যাসিড জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধির লুব্রিকেশন উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে, যা নমনীয়তা বজায় রাখতে এবং বয়স্কদের জয়েন্টের ব্যথা কমাতে কিছুটা সহায়ক হতে পারে।
মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য: মস্তিষ্কের প্রায় ৬০% ফ্যাট দিয়ে গঠিত এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের প্রয়োজন হয় মস্তিষ্কের কোষের স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য। ঘিতে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট মস্তিষ্কের পুষ্টি জুগিয়ে স্মৃতিশক্তি এবং মনোযোগ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘি ওমেগা ৩-এর একটি দারুণ উৎস। এ ছাড়া এটি ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ভিটামিন এ, ই, ডি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। তাই নিয়মিত ১ চা চামচ ঘি খাওয়ার অভ্যাস আপনার শরীরের সব কোষের বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। ঘিতে পাওয়া স্বাস্থ্যকর এবং সমৃদ্ধ ফ্যাটি অ্যাসিড আপনার চুলে শুধু পুষ্টি জোগায় না বরং এটিকে নরম, চকচকে এবং স্বাস্থ্যকর করে তোলে।
তাই ঘি খাওয়া বা চুলে লাগানো উভয়ই উপকারী। চুলের যত্নে ঘিয়ের গুণের কথা না বললেই নয়। ঘিতে থাকা উপাদান চুলের বৃদ্ধিকে উদ্দীপিত করে, চুলকে কন্ডিশন করার পাশাপাশি ত্বককে হাইড্রেট করে এবং পুষ্টি জোগায়। আপনার চুলে খুশকি সমস্যা কিংবা ত্বকে চুলকানির সমস্যা থাকলে তা থেকে সহজেই মুক্তি পেতে পারেন নিয়মিত ঘি খাওয়ার মাধ্যমে।
ত্বকের নানান সমস্যার সমাধানে, কর্মক্ষমতা বাড়াতে, স্ট্রেস কমাতে, কোষকে পুনর্জীবিত করতে, বাট্রিক অ্যাসিডেন উপাদানের জন্য পরিপাকতন্ত্রের ক্ষমতা বাড়াতে ঘিয়ের জুরি নেই। ভিটামিন ডি এর উৎস এই ঘি হাড়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হার্ট ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যও ভালো রাখে। ঘি হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটায়। পাশাপাশি স্টমাক অ্যাসিডের ক্ষরণ বাড়াতে ঘি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এর ফলে বদ-হজম এবং গ্যাস-অম্বল হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়।
প্রতিদিন ঘি খেলে শরীরের অভ্যন্তরে একদিকে যেমন ভিটামিন এ এবং ই-এর ঘাটতি পূরণ হয়, তেমনি অ্যান্টি-অ্যাক্সিডেন্টের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পুষ্টির ঘাটতি দূর হওয়ার পাশাপাশি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ঘি হলো ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস যা জয়েন্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। সকালে গরম পানির সাথে ঘি খেলে জয়েন্টগুলোর তৈলাক্ততা, শক্ততা হ্রাস এবং নমনীয়তা বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে। ঘিতে উপস্থিত উপকারি ফ্যাটি অ্যাসিড, বিশেষত লরিক অ্যাসিড একদিকে যেমন এনার্জির ঘাটতি দূর করে শরীরকে চাঙ্গা করে, তেমনি শরীরকে সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।
হঠাৎ সর্দি, কাশি বা কফ থেকে মুক্তি পেতে কিংবা আকর্ষণীয় ত্বকের অধিকারী হতে রূপচর্চায় ব্যবহার করতে পারেন ঘিকে। ঘি খাওয়ার ফলে শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে। তাই শীতের ডায়েটে নিয়মিত রাখতে পারেন ঘি। ১। সীমিত পরিমাণের বেশি ঘি খাওয়া হয় তবে শরীরে এর উপকারিতা নয় বরং দেখা দেবে এ খাবারের অপকারিতা। বমিভাবের সঙ্গে দেখা দিতে পারে অস্থিরতাও।
২। যারা অফিসে দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বসে কাজ করে থাকেন তবে তাদের ঘি মোটেও খাওয়া উচিত নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদি তারা ঘি খেতে চান তবে তাদের অবশ্যই নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস থাকতে হবে।
৩। যারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তারাও ঘি এড়িয়ে চলুন। কারণ ঘি ডায়াবেটিস রোগীদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাতে পারে।
