ডাল বাঙালির প্রতিদিনের খাবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভাতের সঙ্গে এক বাটি গরম ডাল যেন একেবারে ঘরোয়া স্বস্তির প্রতীক। কিন্তু ডাল রান্না করতে গেলেই একটি বিষয় প্রায়ই চোখে পড়ে সেটা হলো ডাল রান্নার করার সময় ওপরে সাদা ফেনার মতো স্তর জমে ওঠে। কেউ সেটিকে ময়লা ভেবে ফেলে দেন, আবার কেউ তা নাড়াচাড়া করে মিশিয়ে দেন। কিন্তু এই ফেনা আসলে কী, এবং এটি শরীরের জন্য ভালো নাকি খারাপ,এই প্রশ্ন অনেকের মনেই ঘুরপাক খায়।
সাদা ফেনা কেন হয়?
ডাল ফোটার সময় যে সাদা ফেনা তৈরি হয়, তা কোনো বাইরের ময়লা নয়। এটি মূলত ডালের ভেতরে থাকা প্রোটিন, সামান্য স্টার্চ এবং ‘স্যাপোনিন’ নামের একটি প্রাকৃতিক উপাদানের মিশ্রণ। স্যাপোনিন উদ্ভিদের একটি প্রতিরক্ষামূলক উপাদান, যা পোকামাকড় বা জীবাণুর আক্রমণ থেকে উদ্ভিদকে রক্ষা করে। রান্নার সময় যখন ডাল গরম পানিতে ফুটতে থাকে, তখন এই উপাদানগুলো পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে উপরে উঠে আসে এবং ফেনার মতো স্তর তৈরি করে। তাই এই ফেনা দেখা একেবারেই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।
স্যাপোনিন উপকারী না ক্ষতিকর?
স্যাপোনিন নিয়ে অনেকের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে। আসলে এটি সম্পূর্ণ খারাপ কিছু নয়। বরং অল্প পরিমাণে স্যাপোনিন শরীরের জন্য উপকারী। এটি প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সমস্যা হয় যখন এর পরিমাণ বেশি হয়ে যায়। অতিরিক্ত স্যাপোনিন ডালের স্বাদে তিতকুটে ভাব আনতে পারে। পাশাপাশি এটি অন্ত্রের লাইনিংয়ে কিছুটা অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যাদের হজম সংবেদনশীল, তাদের জন্য এটি কিছুটা বিরক্তিকর হতে পারে।
কারা এই ফেনা এড়িয়ে চলবেন?
যাদের ‘ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম’ (আইবিএস) বা হজমের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য ডালের এই ফেনা কিছুটা সমস্যার কারণ হতে পারে। এতে পেট ফাঁপা, গ্যাস বা অস্বস্তি বেড়ে যেতে পারে। তাই এই ধরনের সমস্যায় রয়েছে তাদের জন্য ডাল রান্নার সময় ওপরের ফেনা তুলে ফেলে দেওয়াই ভালো। এতে হজমের সমস্যা কিছুটা কমানো সম্ভব।
প্রেশার কুকার নাকি প্যানে ডাল রান্নাা কবেন
অনেকের ধারণা, প্রেশার কুকারে ডাল রান্না করলে ফেনা ভেতরে থেকেই যায়, যা পরে পেটের সমস্যার কারণ হতে পারে। তবে এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়।আসলে পেট ফাঁপা বা গ্যাস হওয়ার মূল কারণ ডালের ফেনা নয়, বরং এতে থাকা ফডম্যাপস নামের এক ধরনের জটিল শর্করা। মানুষের শরীর এই শর্করা সহজে হজম করতে পারে না, ফলে গ্যাস তৈরি হয়।
প্রেশার কুকারে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে রান্না করার ফলে এই ফডম্যাপস এবং স্যাপোনিন অনেকটাই ভেঙে যায়। ফলে ডাল আরও নরম ও সহজপাচ্য হয়ে ওঠে। তাই সঠিকভাবে রান্না করলে প্রেশার কুকারে ডাল খাওয়াও নিরাপদ এবং উপকারী।
ডাল খেলে পেটের সমস্যা কমানোর উপায়
ডাল খাওয়ার পর অনেকেই পেট ফাঁপা বা গ্যাসের সমস্যা তৈরি হয়। তবে কিছু সহজ কৌশল মেনে চললে এই সমস্যা অনেকটাই কমানো যায়।
১. ডাল রান্নার আগে অন্তত ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখা উচিত। এতে জটিল শর্করা আংশিক ভেঙে যায় এবং ডাল সহজে হজম হয়।
২. ডালে জিরা, আদা বা হলুদ দিয়ে ফোড়ন দিলে তা শুধু স্বাদই বাড়ায় না, বরং হজমেও সাহায্য করে। বিশেষ করে আদা ও জিরা পেটের গ্যাস কমাতে কার্যকর।
৩. ডাল ভালোভাবে সেদ্ধ করা খুবই জরুরি। আধাসেদ্ধ ডাল হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই ডাল পুরোপুরি নরম করে রান্না করা উচিত। অনেকেই ডাল ঘেঁটে নেন, যা হজমের জন্য আরও উপকারী।
ফেনা রাখবেন নাকি ফেলবেন?
এখন প্রশ্ন হলো,এই ফেনা রাখা উচিত, নাকি ফেলে দেওয়া ভালো? এর উত্তর নির্ভর করে ব্যক্তির শরীরের ওপর। যদি আপনার কোনো হজম সমস্যা না থাকে, তাহলে ফেনা না ফেললেও তেমন ক্ষতি নেই। তবে যদি পেট সংবেদনশীল হয় বা গ্যাসের সমস্যা থাকে, তাহলে ফেনা তুলে ফেলা ভালো।
ডাল রান্নার সময় যে সাদা ফেনা দেখা যায়, তা কোনো ময়লা নয়, বরং প্রাকৃতিক উপাদানেরই অংশ। এটি একেবারে স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। তবে ব্যক্তিভেদে এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
