এস এম আজাদ হোসেন
রাত বারোটার এক মিনিট-
নগর থেমে থাকে,
কিন্তু শব্দেরা জেগে ওঠে নিঃশব্দ শপথে।
শীতের ভেজা বাতাসে কাঁপে না কেবল ফুলের পাপড়ি,
কাঁপে ইতিহাসের ভেতর লুকানো গুলির শব্দ।
আমি হাঁটি-
খালি পায়ে নয়,
ডিজিটাল যুগের জুতো পায়ে,
তবু মাটির স্পর্শ খুঁজি।
কারণ এই মাটি জানে
কীভাবে উচ্চারিত হয়েছিল প্রথম প্রতিবাদ,
কীভাবে বুক চিরে বেরিয়েছিল
একটি ভাষার নাম-
বাংলা।
১৯৫২-র দুপুর এখনো শুকায়নি।
রক্তের লাল এখনো লুকিয়ে আছে
আমাদের বর্ণমালার বাঁকে।
অ, আ, ক, খ-
প্রতিটি অক্ষর যেন একেকটি শহীদের কাঁধে ভর করে দাঁড়ানো।
সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার-
তোমরা কি জানো,
আজকের শিশুরা মোবাইল স্ক্রিনে আঙুল ছুঁয়ে
বাংলা লিখে?
তোমাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে
আমরা এখন ই-মেইল পাঠাই,
কোড লিখি,
গান আপলোড করি-
তবু ভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে
আমাদের দায় কি কমে গেছে?
একুশ মানে শুধু ফুল নয়,
শোকের ব্যাজ নয়,
সাদা-কালো পোশাকের আড়াল নয়-
একুশ মানে অন্যায়ের সামনে দাঁড়ানোর সাহস।
যে সাহস বলে-
আমার কণ্ঠ কেড়ে নিলে
আমি বুকের রক্ত দিয়ে লিখব শব্দ।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-
এই নামটি এখন সীমান্ত চেনে না।
পাহাড়ের ভাষা,
সমতলের ভাষা,
নদীর ধারে হারিয়ে যাওয়া উপভাষা-
সবাই আজ মাথা তোলে একসাথে।
কারণ একুশ শিখিয়েছে,
ভাষা মানে কেবল যোগাযোগ নয়,
ভাষা মানে পরিচয়,
ভাষা মানে অস্তিত্বের ঘোষণা।
এই শহরে এখন উড়ালপুল,
মেট্রোরেলের শব্দ,
ডিজিটাল বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন।
তবু রাত বারোটায়
মানুষ নেমে আসে
একটি স্মৃতিস্তম্ভের দিকে-
কারণ উন্নয়ন যতই হোক,
শেকড় ছাড়া গাছ বাঁচে না।
আমি দেখি-
এক তরুণী হাতে প্ল্যাকার্ড,
লিখেছে:
ভাষার অধিকার মানে মানুষের অধিকার।
এক বৃদ্ধ ধীরে হাঁটছেন,
চোখে জল,
সম্ভবত তিনি জানেন
১৪৪ ধারা কাকে বলে।
একুশ আমাদের শেখায়-
গণতন্ত্রের শুরু হয় ভাষা থেকে,
সমতার শুরু হয় উচ্চারণ থেকে।
যে জাতি নিজের ভাষাকে ভালোবাসে না,
সে জাতি নিজের মানুষকেও ভালোবাসতে শেখে না।
তাই আজ,
ফুল রাখার পর
চল ফিরে যাই ঘরে-
কিন্তু বদলে যাই ভেতরে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলি স্পষ্ট বাংলা,
ঘৃণার বদলে লিখি সহমর্মিতা,
বিভেদের বদলে উচ্চারণ করি একতা।
অমর একুশে ফেব্রুয়ারি-
তুমি কেবল একটি দিন নও,
তুমি এক অবিরাম প্রশ্ন-
আমরা কি ভাষার মর্যাদা রাখছি?
আমরা কি সত্য উচ্চারণের সাহস রাখছি?
যতদিন একটি শিশু
মায়ের মুখে প্রথম শব্দ শুনে হাসবে,
যতদিন কেউ বলবে
এই ভাষাই আমার ঘর-
ততদিন একুশ অমর,
ততদিন ভাষা বেঁচে থাকবে
মানুষের হৃদয়ের গভীরতম উচ্চারণে।
