দুয়েকটি ‘অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা’ ছাড়া এবারের ঈদযাত্রা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ‘স্বস্তিদায়ক’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
রোববার (২৯ মার্চ) সচিবালয়ে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, সড়কে সার্বিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সরকারের কার্যক্রম জোরদার করতে উচ্চপর্যায়ের এক সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘ঈদের জার্নি স্মুথ হয়েছে বলেই আমি মনে করি। কারণ দেড় কোটি মানুষ তিন দিনের মধ্যে ঢাকা ছাড়তে চেয়েছে, দু-একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটার জন্য আমরা দুঃখিত, জাতি দুঃখিত, জাতি ভারাক্রান্ত, মর্মাহত। একটা প্রাণেরও মানে ‘ডিপারচার’ কেউ চায় না। দুটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া যানজট বলেন, মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অথবা যানবাহনের অভাবে বাড়ি যেতে পারছেন না, ঈদের দিনও রাস্তায় কেটেছে—এরকম আগে ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মনে করছি যেকোনো সময়ের চেয়ে দেড় কোটি মানুষ নিরাপদে, স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে সক্ষম হয়েছে। যদিও আমি বলছি যে, দুই-তিনটি দুর্ঘটনা আমাদের ব্যথিত করেছে এবং যেটাকে বলা হয় ভারাক্রান্ত করেছে।’
দুর্ঘটনার জন্য আসলে দায়ী কারা-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, দুর্ঘটনার জন্য কাউকে বিশেষভাবে দায়ী আমি করতে চাই না। তবে এর সঙ্গে যাদের প্রাথমিক পর্যায়ে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তদন্ত কমিটি করে তো এগুলো দেখতে হচ্ছে, যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছি, ডিপার্টমেন্টাল ব্যবস্থা— যে যেখানে আছে সেটা কিন্তু আমরা নিয়েছি।’
রবিউল আলম বলেন, ‘যেমন রেলের আপনি জানেন ওই দুজন গার্ডকে বহিষ্কার করা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের যে বস ছিল সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার যিনি ওখানে ওই গার্ডগুলো রাখা এবং তারা ফাংশন করছে কি না, উপস্থিত আছে কি না— এ যে অফিসারের দায়িত্ব ছিল, তাকেও আমরা চাকরিচ্যুত করে ব্যবস্থা নিয়েছি। অর্থাৎ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রী নিয়ে পদ্মায় ডুবে যাওয়া সৌহার্দ্য পরিবহনের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না হলে শুধু ওই বাসটি না, ওই কোম্পানির সব বাসের রেজিস্ট্রেশন বা রুট পারমিট বাতিল হয়ে যাবে। যদি তাকে যে কারণ দর্শানো অথবা তার কাছে যে জবাব চাওয়া হয়েছে তার সন্তোষজনক উত্তর না হয়। সেই প্রক্রিয়ায় আমরা চলে গিয়েছি।’
এদিকে বাংলাদেশ রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ১৭ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত দেশে ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৮ জনের মৃত্যু তথ্য তুলে ধরা হলেও, সড়কমন্ত্রীর ভাষ্য মৃত্যুর এই সংখ্যাটি ‘সঠিক নয়’। অতীতের চেয়ে এবারের ঈদ যাত্রায় মৃত্যু ‘কম হয়েছে’ বলেও দাবি করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘নিহত নিয়ে যেটা বলেছেন, আমার মনে হয় যে আপনাদের পরিসংখ্যানের সাথে আমার দ্বিমত হবে। আমরা বিআরটিএ, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে অথরিটি সবকিছু মিলিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তথ্য-উপাত্ত কালেক্ট করি। সেখানে এবার আপনার মৃত্যুর সংখ্যা হচ্ছে রোড দুর্ঘটনায়, সড়ক এবং নৌপথে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে— ১৭০ জন আমার কাছে। তার মধ্যে মহাসড়কে ৪৭ জন, ২৮ জন হচ্ছে নৌপথে, ১৭ জন সম্ভবত হচ্ছে রেলপথে। গত বছর ঈদের সময় ১১ দিনে দুর্ঘটনায় ১৮৭ জন মারা গেছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমি এ পরিসংখ্যান দিয়ে তুলনা করতে চাচ্ছি না, কোনো মৃত্যুই কাম্য না— আমি প্রথমে বলেছি। তবে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি এ কথা বলা ঠিক হবে না, নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, আগের চেয়ে কম হয়েছে, আগামীতে আমরা আরও কম করব। সেই জন্যই কিন্তু আজকের এই প্রস্তুতি সভা, আজ আলোচনা সভা।’
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানান, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো পর্যালোচনা করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে এই সভা করা হয়। সভায় সড়ক পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িত পুলিশ, বিআরটিএ, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আগামী ঈদুল আজহা সামনে রেখে যাত্রা আরও নিরাপদ ও যানজটমুক্ত করতে বিভিন্ন সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে।
সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে মহাসড়কে অস্থায়ী বাজার বসতে না দেওয়া, ট্রাক ও পণ্যবাহী যান চলাচলে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় বাড়তি নজরদারি। বিশেষ করে গাজীপুর-চন্দ্রা ও সফিপুর এলাকায় যানজট কমাতে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান শেখ রবিউল আলম।
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে মহাসড়কের পাশে যত্রতত্র টিকিট কাউন্টার বসানো যাবে না। নির্ধারিত বাস টার্মিনাল থেকেই টিকিট বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
ফেরি পারাপারের ক্ষেত্রে যাত্রী নামিয়ে তারপর যানবাহন ওঠানো বাধ্যতামূলক করা হবে জানিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে কঠোরভাবে নজরদারি বাড়ানো হবে।’
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে মন্ত্রী জানান, সব গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকিং চালু করা হবে। এর মাধ্যমে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, রুট ভায়োলেশন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল সহজে শনাক্ত করা যাবে। জিপিএসের মাধ্যমে ওভারস্পিড বা নির্ধারিত রুটের বাইরে চলাচল করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে এই ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা পরিচালনা করবে। ইতিমধ্যে সিসিটিভি ও স্পিড ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি কার্যক্রম চালু রয়েছে, যা আরও সম্প্রসারণ করা হবে।’
মন্ত্রী দাবি করেন, ‘সার্বিক ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ে তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগের ফলে এবারের ঈদযাত্রা তুলনামূলকভাবে সফল হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে আরও উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।’
