টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ১৫ জন শ্রমজীবী মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপদ সড়ক চাই এর পক্ষ থেকে মহাসচিব লিটন এরশাদ এক বিবৃতি প্রদান করেছেন। বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন- প্রতিবছর ঈদ আসে আনন্দ, ভালোবাসা আর পরিবারে ফেরার আবেগ নিয়ে। কিন্তু এই আনন্দযাত্রাই যেন প্রতি বছর রূপ নেয় মৃত্যুর মিছিলে। সড়কে ঝরে যায় অসংখ্য প্রাণ, নিভে যায় বহু পরিবারের স্বপ্ন। নিরাপদ সড়ক চাই’র কাছে তাই ঈদ মানেই এখন এক ধরনের আতঙ্ক, এক ধরনের বেদনার অনুভূতি।
সরকার প্রতিবছর ঈদকেন্দ্রিক সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। মহাসড়কে নজরদারি বৃদ্ধি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকদের সতর্কতা বৃদ্ধি এবং যাত্রীদের সচেতন করতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই নিরাপদ যাত্রার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তারপরও কেন প্রতি বছর সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই?
আজ ২৫ মে সোমবার টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই একটি ট্রাক খাদে পড়ে ১৫ জন শ্রমজীবী মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা পুরো জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। যারা মারা গেছেন তারা কেউ ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন না। তারা ছিলেন দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। হয়তো পরিবারে ঈদের বাজার করার স্বপ্ন ছিল, সন্তানের হাতে নতুন কাপড় তুলে দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু জীবিকার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকের ওপরে চড়ে যাত্রা করতে গিয়ে তাদের প্রাণ দিতে হলো।
এই মৃত্যুর দায়ভার কার?
প্রশ্ন উঠছে, মহাসড়কে এভাবে শ্রমিক বহন করা কতটা বৈধ এবং মানবিক? একটি পণ্যবাহী ট্রাকে মানুষ পরিবহন করা কেন বন্ধ করা গেল না? চালক কি পর্যাপ্ত বিশ্রামে ছিলেন? তিনি কি সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন? অতিরিক্ত কাজের চাপ, ঘুমের ঘাটতি কিংবা বেপরোয়া গতির কারণে কি এই দুর্ঘটনা ঘটেছে?
আরও বড় প্রশ্ন হলো, ট্রাক মালিকের ভূমিকা কী ছিল? শ্রমিকদের এভাবে বহনের নির্দেশনা কি মালিক দিয়েছিলেন? যদি দিয়ে থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি? আর যদি না দিয়ে থাকেন, তাহলে কীভাবে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন চলতে থাকলো?
নিরাপদ সড়ক চাই বিভিন্ন সরকারি সেমিনার ও সভায় অংশগ্রহণ করে জানতে পেরেছে, মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান দায়িত্বে থাকা হাইওয়ে পুলিশের পর্যাপ্ত জনবল নেই। সীমিত জনবল নিয়ে তারা দেশের বিস্তীর্ণ সড়ক নেটওয়ার্কে কার্যকর নজরদারি করতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, যদি পর্যাপ্ত মনিটরিংই না থাকে, তাহলে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে?
মহাসড়কে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা হয়নি কেন? ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান কেন দৃশ্যমান নয়? সড়কে আইন প্রয়োগে শিথিলতা কেন থাকবে, যখন প্রতিটি অবহেলার মূল্য দিতে হচ্ছে মানুষের জীবন দিয়ে?
আজ যে ১৫ জন শ্রমজীবী মানুষ প্রাণ হারালেন, তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ কী হবে? যে সন্তান বাবার অপেক্ষায় ছিল, সে এখন কাকে বাবা বলে ডাকবে? যে মা ছেলের জন্য ঈদের খাবার প্রস্তুত করছিলেন, তিনি এখন কীভাবে সন্তানের লাশের মুখোমুখি হবেন? যে স্ত্রী স্বামীর আয়ের উপর নির্ভর করতেন, তিনি এখন কীভাবে সংসার চালাবেন?
এই মানুষগুলো হয়তো টাকার অভাবে, বিকল্প পরিবহন না থাকায়, কিংবা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদে সেই ট্রাকে উঠতে বাধ্য হয়েছিলেন। দারিদ্র্য যেন তাদের জীবনের পাশাপাশি মৃত্যুকেও নির্ধারণ করে দিল।
নিরাপদ সড়ক চাই আজ জাতির কাছে প্রশ্ন রাখতে চায়, আর কত প্রাণ ঝরলে আমাদের বিবেক জাগ্রত হবে? আর কত পরিবার নিঃস্ব হলে আমরা কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করব?
সড়ক দুর্ঘটনা কখনোই শুধুমাত্র একটি ‘দুর্ঘটনা’ নয়। এর পেছনে থাকে অব্যবস্থা, অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং জবাবদিহিতার অভাব। তাই এই ১৫টি প্রাণহানির দায় শুধু একজন চালকের নয়, শুধু একজন মালিকের নয়, শুধু একটি প্রতিষ্ঠানেরও নয়। এই দায়ভার আমাদের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার উপরই বর্তায়।
মানুষ চায় নিরাপদে বাড়ি ফিরতে। ঈদের আনন্দ যেন আর কোনো মায়ের চোখের জল না হয়, কোনো শিশুর এতিম হওয়ার কারণ না হয়। এখনই সময় সড়কে শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা এবং মানবিক দায়বদ্ধতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার। নইলে প্রতি ঈদেই নতুন নতুন লাশের মিছিল আমাদের ব্যর্থতার সাক্ষী হয়ে থাকবে।
