পবিত্র ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে মর্মান্তিক সড়ক ঘটনায় ২৭৪ জনের প্রাণহানির চিত্র সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় হতাহতদের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মাঝে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক, শঙ্কা এবং নিরাপত্তাহীনতা।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয় এবারের ঈদে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় হতাহতদের প্রতি গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এক বার্তায় তিনি বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং চালকদের অসতর্কতা। কিছু স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম প্রশংসনীয় হলেও, অনেক জায়গায় আইন প্রয়োগে ধীরগতি ও শৈথিল্য স্পষ্ট ছিল। ফলে অনিয়ন্ত্রিত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রতি বছর ঈদকে সামনে রেখে নিসচার স্বেচ্ছাসেবকরা দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে থাকেন। যেখানে এই সমন্বিত উদ্যোগ কার্যকর হয়েছে, সেখানে সড়কের বিশৃঙ্খলা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো—সারাদেশে সব জায়গায় নিসচার উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। তাই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরই বর্তায়।
অন্যদিকে, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, এবং পরিবহন খাতে অনিয়মও এবারের ঈদ যাত্রাকে আরও দুর্ভোগপূর্ণ করে তুলেছে। এসব বিষয় সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয় বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নতুন করে প্রস্তাবনার চেয়ে অতীতে যেসব প্রস্তাবনা ও সুপারিশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে জরুরি। তিনি মনে করেন, বিদ্যমান সুপারিশগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি বলেন, “নির্বাচনের সময় প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা রোধে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। যদি এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা হতো, তাহলে দেশের সড়ক পরিস্থিতি অনেক বেশি নিরাপদ হতে পারতো।”
জয় আরও উল্লেখ করেন, এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় (বেসরকারি হিসাবে) ২৭৪ জনের প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এত প্রাণহানির পর সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কিছু মন্তব্য প্রকাশ পেয়েছে, যা প্রকৃত অর্থে দায়িত্বশীলতার ঘাটতি নির্দেশ করে।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “দুর্ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সব দুর্ঘটনাই অনাকাঙ্ক্ষিত বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দুর্ঘটনার পেছনে স্পষ্ট কারণ থাকে—অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, দুর্বল আইন প্রয়োগ, অদক্ষতা—এসবই মূল কারণ।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “প্রতিটি দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। কেন দুর্ঘটনা ঘটলো, কোথায় ঘাটতি ছিল, কীভাবে তা প্রতিরোধ করা যেত—এসব বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে দায় এড়িয়ে গেলে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব নয়, বরং ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি হবে।”
আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এবারের ঈদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের শুধু পরিবহন ভাড়া নিয়ে আলোচনা করতে বেশি দেখা গেছে। কোন বাস কত ভাড়া কম নিলো, সেটির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা রোধে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে—এসব বিষয়ে কার্যকর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ বা তদারকি তেমনভাবে লক্ষ্য করা যায়নি।”
তিনি আরও বলেন, “উচ্চ পর্যায় থেকে এমন মন্তব্যও শোনা গেছে—ঈদে ঢাকা থেকে দেড় কোটি মানুষ বাড়ি গেছে, এর মধ্যে ২০০-৩০০ জন মারা গেছে। এ ধরনের বক্তব্য সত্যিই বেদনাদায়ক ও অগ্রহণযোগ্য। ঈদে বাড়ি ফেরা কোনো যুদ্ধ নয় যে সেখানে প্রাণহানি ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নিতে হবে। মানুষ আনন্দ করতে, পরিবারের কাছে ফিরতে যায়—তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
জয় প্রশ্ন তোলেন, “এই মানুষগুলোর জীবনের নিরাপত্তা কে দেবে? কেন তারা নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না? কেন একটি আনন্দমুখর যাত্রা শোকের ঘটনায় পরিণত হবে?”
তিনি আরও বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু মৌখিক বক্তব্য নয়, কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, জবাবদিহিতা, এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ।
পরিশেষে মিরাজুল মইন জয় আশা প্রকাশ করে বলেন, “এবারের ঈদের দুর্ঘটনাগুলো থেকে সরকার শিক্ষা নেবে এবং আগামী ঈদযাত্রাকে নিরাপদ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “শুধু ঈদ নয়, সারা বছরব্যাপী দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সরকারকে যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “প্রয়োজনবোধে জনবল ও দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিসচা সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। সরকার চাইলে নিসচা সবসময় পাশে থেকে কাজ করবে—একটি নিরাপদ সড়কব্যবস্থা গড়ে তুলতে।”
সবশেষে তিনি বলেন, “সড়ক নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।”
