গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টায় নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রধান কার্যালয়ে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ২০২৬-২০২৭ মেয়াদে নতুন কমিটি এবং ২০২৪-২০২৬ মেয়াদে বিদায়ী কমিটির যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয়। সভার শুরুতে বিদায়ী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব গনি মিয়া বাবুল সভা পরিচালনা করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান কমিটির মহাসচিব লিটন এরশাদের নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। পরে মহাসচিব লিটন এরশাদের সঞ্চালনায় মূল সভা কার্যক্রম শুরু হয়।

সভা শুরুর প্রাক্কালে মহাসচিব সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং সকলের কাছে সংগঠনের কার্যক্রম বেগবান করতে সার্বিক সহযোগীতা কামনা করেন। তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

সভার বিশেষ আকর্ষণ ছিলো নিসচার প্রতিষ্ঠাতা, বরেণ্য চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন-এর ভার্চুয়াল উপস্থিতি। তিনি লন্ডন থেকে অনলাইনে সভায় যুক্ত হন।
স্ক্রিনে প্রিয় নেতার মুখ ভেসে উঠতেই উপস্থিত সড়ক যোদ্ধাদের মাঝে এক অনির্বচনীয় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বক্তব্যের শুরুতেই কিছুটা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, চিকিৎসাজনিত কারণে তিনি দেশ ও সংগঠনের কার্যক্রম থেকে শারীরিকভাবে দূরে আছেন। কিন্তু তার মন-প্রাণ পড়ে আছে নিসচার প্রতিটি কর্মী, প্রতিটি সড়ক যোদ্ধার সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমি দূরে আছি ঠিকই, কিন্তু বিশ্বাস করুন—আমার হৃদস্পন্দন এখনো নিসচার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার আপনাদের মাঝে ফিরে আসতে পারি।”
নতুন কমিটির প্রসঙ্গে তিনি গভীর আস্থা প্রকাশ করে বলেন, এবারের কমিটি গঠন হয়েছে তার ছেলে মিরাজুল মইন জয়ের নেতৃত্বে। এই কমিটির প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন ও দোয়া রয়েছে। তিনি দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন, আগামী দুই বছরে এই কমিটি সংগঠনকে আরও গতিশীল, আরও শক্তিশালী এবং আরও কার্যকর করে তুলবে।
তিনি আরও বলেন, দেশ ছাড়ার পরও কেন্দ্র থেকে শুরু করে সারাদেশের সড়ক যোদ্ধারা যেভাবে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, তা তাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে। তিনি প্রত্যেকের জন্য আন্তরিক দোয়া ও কৃতজ্ঞতা জানান।
আবেগমাখা কণ্ঠে তিনি স্মরণ করেন ৩২ বছর আগের সেই স্বপ্নের কথা—একটি নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন, যেখানে সড়কে আর ঝরবে না প্রাণ। তিনি বলেন, “আমি যে স্বপ্ন নিয়ে নিসচার পথচলা শুরু করেছিলাম—বাংলাদেশে একদিন নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা হবেই। সেই দিন আর বেশি দূরে নয়। ইনশাআল্লাহ, ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে একদিন আমরা সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেব।”
শেষে তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধ থেকে একে অপরকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। তার দৃঢ় বিশ্বাস, মিরাজুল মইন জয়ের নেতৃত্বে নিসচার প্রতিটি স্তরের সড়ক যোদ্ধারা সংগঠনকে আরও আলোকিত করবে এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।

এরপর বক্তব্য রাখেন সংগঠনের নবনির্বাচিত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয়। তার বক্তব্য ছিল দৃঢ় অঙ্গীকার, কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধে পরিপূর্ণ।
তিনি বলেন, দেশের বাইরে অবস্থান করলেও দেশে কর্মিদের কর্মকান্ড দেখে কখনোই তার মনে হয়নি যে তিনি নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রতিনিয়ত তার মনে হয়, তিনি যেন প্রতিটি কর্মসূচিতে, প্রতিটি মানববন্ধনে, প্রতিটি সচেতনতামূলক কার্যক্রমে সড়ক যোদ্ধাদের সঙ্গেই আছেন।
তিনি বলেন, “আমি শারীরিকভাবে দেশের বাইরে থাকলেও মানসিকভাবে আমি সবসময় আপনাদের মাঝেই আছি। নিসচার প্রতিটি কার্যক্রম, প্রতিটি উদ্যোগ আমার হৃদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”
কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে সারাদেশের শাখা কমিটির নেতাকর্মীরা যে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন—তার জন্য তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই ঐক্য ও ত্যাগের মনোভাবই নিসচার শক্তি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নিসচার প্রতিষ্ঠাতা বরেণ্য চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন যে আস্থা রেখে নতুন কমিটি গঠন করেছেন, সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করা তাদের সবার দায়িত্ব।
মিরাজুল মইন জয় বলেন, “আমি আশা রাখি, আমার নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি আগামী দিনে সকলের প্রত্যাশা পূরণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। আমরা ব্যক্তিস্বার্থ নয়, সংগঠনের আদর্শ ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে যাব। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করাই হবে আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।”
শেষে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে প্রতিশ্রুতি দেন “আমি কথা দিচ্ছি, সবসময় আপনাদের পাশে থাকব। সংগঠনের প্রতিটি প্রয়োজনে, প্রতিটি চ্যালেঞ্জে, প্রতিটি সংগ্রামে আমি আপনাদের সঙ্গে আছি এবং থাকব। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় আমরা নিসচাকে আরও সুসংগঠিত ও গতিশীল করে তুলব, ইনশাআল্লাহ।”
মিরাজুল মইন জয়ের বক্তব্যের পর সভায় ২০২৬–২০২৭ মেয়াদের নতুন কমিটির তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।

এরপর ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন বাবুল এর পরিচালনায় নতুন কমিটির নেতৃবৃন্দরা শপথ গ্রহন করেন।
শপথ গ্রহন শেষে সভায় বক্তব্য রাখেন, ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন বাবুল, এস এম আজাদ হোসেন, ব্যারিস্টার এম আর হাসান, যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট তৌফিক আহসান টিটু, অর্থ সম্পাদক আসাদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুর রহমান, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক জনাব মো. মাজহারুল ইসলাম, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক রুমানা ইসলাম মুক্তি, কার্যনির্বাহী সদস্য মোঃ আতাউর রহমান মোল্লা, মোঃ মোবারক হোসেন।
উক্ত সভায় আলোচনা শেষে সংগঠনের কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয় যা নিম্নরূপ:
১) ১১তম মহাসমাবেশ আগামী জুনে অনুষ্ঠিত হবে। তারিখ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান চূড়ান্ত করবেন।
২) ১১তম মমহাসমাবেশের উদযাপন কমিটিরি আহবায়ক জনাব এড. তৌফিক আহসান টিটু ও সদস্য সচিব জনাব আব্দুর রহমানকে করা হয়। অন্যান্য সদস্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের সাথে কথা বলে চূড়ান্ত করবেন।
৩) ১১তম মহাসমাবেশ উপলক্ষে একটি অর্থ কমিটি করা হয়। যার আহবায়ক জনাব আসাদুর রহমান ও সদস্য সচিব জনাব মফিজুর রহমান খান বাবুকে করা হয়।
৪) ১১তম মহাসমাবেশ উপলক্ষে অন্যান্য উপকমিটি পরবর্তীতে গঠন করা হবে।
৫) ২০২৬ সালের বাজেট নির্ধারণ এবং কর্মসূচি তালিকা তৈরি করে সম্পূর্ণ কর্মপরিকল্পনা লিখিত আকারে পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করতে হবে।
৬) সম্মানিত ভাইস চেয়াম্যোন, যুগ্ম মহাসচিবগণ ও সহ সাংগঠনিক সম্পাদকের সমন্বয়ে বিভাগীয় কমিটি গঠন করা।
৭) সকল ভাইস চেয়ারম্যানবৃন্দ ও কমিটির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের নেতৃত্বে শক্তিশালী একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হবে।
৮) যে সকল নেতৃবৃন্দ পরপর ০৩ সভায় উপযুক্ত কারণ ব্যতীত ও অবহিত না করে অনুপস্থিত থাকলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উক্ত পদ শূণ্য বলে ঘোষণা করবেন এবং শূন্যস্থানে পরবর্তীতে সক্রিয় সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
সভায় সিদ্ধান্তগ্রহন শেষে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয় সভার সমাপ্ত ঘোষনা করেন।
