হানিফ সংকেত: ভাইরালিজমের যুগে কেউ রাতারাতি সেলেব্রিটি হয়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ সেলেব্রিটি থেকে খলনায়কে পরিণত হচ্ছেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অধিকাংশ শিল্পী, তারকা ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় মত্ত।
একুশ শতকের পৃথিবীতে ‘ভাইরাস’ শব্দটি কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন আমাদের ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে হাতের স্মার্টফোন পর্যন্ত বিস্তৃত। একদিকে প্রকৃতি প্রদত্ত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জৈবিক ভাইরাস যা মানবদেহে রোগ ছড়ায়, অন্যদিকে মানুষের তৈরি ডিজিটাল দুনিয়ায় ‘ভাইরাল’ হওয়ার উন্মাদনা। এ দুই ধরনের ‘ভাইরাস’ বা ‘ভাইরাল’ প্রবণতা আজ আমাদের জীবনযাত্রা, চিন্তা এবং সমাজকাঠামো আমূল বদলে দিচ্ছে।
বর্তমান বিশ্বে জৈবিক ভাইরাস এবং ভার্চুয়াল ভাইরাল-উভয়ই এক অমোঘ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বর্তমান যুগে কোনো ভিডিও, ছবি বা সংবাদ যখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তাকে আমরা ‘ভাইরাল’ বলি। এর ছড়ানোর প্রক্রিয়াটি হুবহু একটি জৈবিক ভাইরাসের মতো।-একজন থেকে অন্যজনে, অন্যজন থেকে আরও বহুজনে।
কেন মানুষ কোনো কিছু ভাইরাল করে? মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো নতুন বা অদ্ভুত কিছু দেখলে তা অন্যের সঙ্গে শেয়ার করা। এই শেয়ারিং বা ‘সংক্রমণ’ প্রক্রিয়াটি যখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়, তখনই তা ভাইরাসে রূপ নেয়। জৈবিক ভাইরাস যেমন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে দ্রুত ধরে, তেমন ডিজিটাল ভাইরালও মানুষের বিচারবুদ্ধি বা সচেতনতা কম থাকলে দ্রুত মস্তিষ্ক দখল করে নেয়।
মূলত ভাইরাল শব্দটির উৎপত্তি ভাইরাস থেকে। হঠাৎ করেই কয়েক বছর হলো এ শব্দটি মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ভাইরাস শব্দটির অর্থ জীবাণুযুুক্ত, বিষাক্ত বা দূষিত। অর্থাৎ রোগ নামে ভূষিত কিছু, যা মহামারির মতো সংক্রমিত হচ্ছে। কথায় আছে, ‘সুস্থতা সংক্রমিত হয় না, সংক্রমিত হয় রোগ’। ভাইরাস যেমন দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, ভাইরালও তেমন ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন কোনো কনটেন্ট, ছবি, ভিডিও, শব্দ খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভয়ংকরভাবে ছড়িয়ে পড়ে; তখন তাকে বলা হয় ভাইরাল। এটা সোশ্যাল মিডিয়ার এক ধরনের সোশ্যাল নাম। তবে ইতিবাচক বিষয়ের চাইতে নেতিবাচক বিষয়ই বেশি ভাইরাল হয়। অথচ আমাদের চারপাশে ইতিবাচক বিষয়ের ছড়াছড়ি।
একসময় টেলিভিশনে কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে-কোনো অনুষ্ঠান, নাটক বা ছবি দেখলে বা গান শুনলে আমরা প্রশংসা করে বলতাম, বাঃ চমৎকার! খুব ভালো হয়েছে, শ্রুতিমধুর, নান্দনিক, অনবদ্য, অসাধারণ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এখন কোনো কিছু দেখলে এর মূল্যায়ন মানদণ্ড হচ্ছে ভিউ কত মিলিয়ন কিংবা কনটেন্টটি ভাইরাল হয়েছে কি না? অন্তর্জালের এই দুনিয়ায় নির্মিত কিছু কিছু কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু কতটা জনপ্রিয় জানি না, তবে এদের কারণে অশ্লীল শব্দের উৎপাতে ভাইরাল নামক শব্দটি অন্তর্জাল ভরিয়ে বেশ ছড়িয়েছে। সমাজ সমর্থন-অযোগ্য বহুবিধ অসামাজিক কনটেন্টে ভরপুর এখন অন্তর্জাল।
জৈবিক ভাইরাস এবং ডিজিটাল ভাইরালের মধ্যে একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে-উভয়ই দুর্বল জায়গায় আঘাত করে। শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে যেমন জৈবিক ভাইরাস আক্রমণ করে, তেমন মানুষের বিচারবুদ্ধি বা ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ কম থাকলে তারা সস্তা বা ক্ষতিকর ভাইরাল কনটেন্টের শিকার হয়। পার্থক্য হলো, জৈবিক ভাইরাস প্রকৃতিদত্ত, আর ডিজিটাল ভাইরাস আমাদের নিজেদের সৃষ্টি ও মনস্তত্ত্বের ফসল।
এই ভাইরালের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে কেউ কেউ বলেন, ভাইরাস শুনলে ভয় পাই, ভাইরাল দেখলে ছুটে পালাই, তার পরও ভাইরালের ভাইরাস আক্রমণ করবেই। আসলে আমরা ভয়ংকরভাবে ভাইরাল আক্রান্ত হয়ে পড়েছি। এই ইউটিউবের ভিউ ভাইরাস আর নিউ টেকনিকের কারণে কিছু কিছু কনটেন্ট বিষাক্তভাবে আসক্ত করছে অনেককেই। গ্রাস করছে আমাদের সংস্কৃতিকেও। আজকের প্রিন্ট ও টিভি মিডিয়ার চেয়েও ব্যক্তি মিডিয়া শক্তিশালী হয়ে উঠছে দিনদিন। মেইন মিডিয়ার প্রচারিত কোনো বিষয় গান-কবিতা-নাটক ব্যক্তি মিডিয়ায় খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যায় মানুষের কাছে।
ব্যক্তি মিডিয়ায় প্রচারিত সুর-তাল-লয়হীন ভুবন বাদ্যকরের কাঁচা বাদাম আমাদের মেইন মিডিয়ার প্রতি এক ধরনের হুমকি। এমন উদাহরণ আরও অনেক আছে। যা আমাদের মিডিয়াগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভাইরাল শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার (বর্তমান এক্স) ও ইউটিউবের মতো সমাজমাধ্যমগুলোতেই বেশি দেখা যায়। এসব মাধ্যমে দ্রুত কোনো কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়লেই আমরা সেটিকে বলি ভাইরাল। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, আমরা কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়াই এসব নেতিবাচক, অপ্রীতিকর, অশ্লীল, অকল্যাণকর ও অসামাজিক কনটেন্ট শেয়ার করি। ফলে দূষিত হয় সমাজ, দূষিত হয় সংস্কৃতি। অনলাইনে ভাইরাল হওয়ার কারণে মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ, ছড়িয়ে পড়ে ভুল তথ্য।
মার্কিন লেখক সেথ গোডিন প্রথম ভাইরাল শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। ২০০০ সালের ৩১ জুলাই ‘আনলিশ ইয়োর আইডিয়া ভাইরাস’ শিরোনামে তিনি ফাস্ট কোম্পানি ডটকমে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেই থেকেই ভাইরাল শব্দটি ভাইরাল। কারণ সেখানে একটি লাইন ছিল Have the Idea behind your online experience go viral. সেই থেকে ভাইরাল শব্দটি ভাইরাল। তবে ভাইরাল শব্দটি ভাইরাল হওয়ার আগেও এর ব্যবহার ছিল। যেমন ভাইরাল ফিভার (জ্বর, ঠান্ডা লাগা), এখানে সেই ভাইরাসের কারণেই ভাইরাল শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
ছড়িয়ে যাওয়াকেই যদি ভাইরাল বলা হয়, তাহলে অনেক আগে থেকেই এর যাত্রা। খনার বচন, অনেক নীতিবাক্য, লোকগান-গ্রামগঞ্জে প্রচলিত। এসব গান এখন আধুনিক যন্ত্রানুষঙ্গে শিল্পীরা গান। প্রচলিত প্রবচনও উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। যাতে সমাজ কলুষিত হওয়ার শঙ্কা নেই। এ ভাইরালিজমের যুগে কেউ রাতারাতি সেলেব্রিটি হয়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ সেলেব্রিটি থেকে খলনায়কে পরিণত হচ্ছেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অধিকাংশ শিল্পী, তারকা ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় মত্ত। যেসব নাটকের ভিউ বেশি, সেসব নাটকের নির্মাতার নাটক করেন। স্টার হওয়ার জন্য ভাইরাল হতে চেষ্টা করেন- ছবি, ভিডিও, স্ট্যাটাস, পোস্ট কিংবা গোপনে ধারণ করা স্ক্যান্ডাল ভিডিও দিয়ে। কেউ ভাইরাল হচ্ছেন নিজের চেষ্টায়, স্বইচ্ছায় আর কেউ হচ্ছেন অন্যের ফাঁদে পড়ে অনিচ্ছায়। ভাইরাল হওয়ার জন্য অনেকেই হেন কিছু নেই যা করেন না। ভাইরাল হতে হলে কনটেন্টের বিষয়বস্তু নিয়ে চিন্তা করতে হয় না।
উদ্ভট, অশালীন, অশোভন, অর্থহীন যেকোনো কিছু করে কনটেন্ট করলেই হয়। এর জন্য কোনো চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন নেই। ‘ইত্যাদি’তে দেখিয়েছিলাম, ভাইরালপ্রিয় শ্যালক- দুলাভাইয়ের কাছে ভাইরাল হওয়ার জন্য কনটেন্ট নির্মাণের আইডিয়া চাইলে দুলাভাই বলেন, ভাইরালের কনটেন্ট লইয়া আইডিয়া দেওনের কিছু নাই। পাগলামি, ছাগলামি, ছ্যাবলামি, ছ্যাঁচরামি, নোংরামি, ইতরামি, বাঁদরামি, ফাইজলামি, মাতলামি, আঁতলামি-এ রকম যা কিছু আছে বানাইয়া ছাইড়া দে, ভাইরাল হয়ে যাবি। ভাইরাল কনটেন্টের জন্য এত বেশি চিন্তাভাবনার দরকার নেই।
ভাইরালের প্রতি একশ্রেণির মানুষের আকর্ষণ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ যার কনটেন্ট যত বেশি ভিউ হবে, তত বেশি ভাইরাল হবে। যত বেশি ভাইরাল হবে, তত বেশি অর্থ পাবে। গ্রামগঞ্জেও লেখাপড়া না জানা অনেকেই এখন এই সংস্কৃতিচর্চায় উঠেপড়ে লেগেছেন এবং অনেকেই আয় করছেন কল্পনাতীত অর্থ। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে ভাইরাল হয়ে অনেকেই বাড়িগাড়িও করে ফেলেছেন। অনেকে উদ্যোক্তা বনে গেছেন। তাদের শিক্ষা শুধু কীভাবে কনটেন্ট বানাতে হয়, আর আপলোড করতে হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু কিছু কনটেন্ট দেখলে মনে হয় মানুষের ভাবনার জগৎ কত বিচিত্র! এখন অনেকেরই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভাইরাল হওয়া।
অনেকে স্বল্প বেতনের চাকরি ছেড়ে দিয়ে কনটেন্ট বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কারণ যদি একটু ভাইরাল হওয়া যায়, তাহলে এক বছরের রোজগার এক মাসেই করা যাবে। এর জন্য কারও অধীনে চাকরি করারও প্রয়োজন নেই। যে কারণে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এই ভাইরালযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এর ফলে অনেকে অনেক ঝুঁকি নিয়েও কনটেন্ট বানাচ্ছেন। ঘটছে অনেক দুর্ঘটনাও। ঘটছে অঙ্গহানি। তার পরও ভাইরাল প্রতিযোগিতায় মানুষের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। যাচ্ছেতাই করে ভাইরাল হওয়ার এ সংস্কৃতি দেশের তরুণ প্রজন্মকে ভিন্ন এক সংস্কৃতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অশ্লীলতার প্রশ্রয়ে ক্রমেই লেখাপড়া, পরিবার-পরিজন ও সভ্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেকেই আছেন, মানুষের আবেগ-অনুভূতি পুঁজি করে ভাইরাল হতে চেষ্টা করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন লোকদেখানো মানবসেবীরও অভাব নেই। কেউ লাইভে এসে দরিদ্র, ভিখিরি কিংবা রিকশাচালকের বিশ্বাস ও সততা পরীক্ষা করে অর্থ দিচ্ছেন। কেউ অসহায় মানুষকে সেবা করার নামে কনটেন্ট বানিয়ে ভাইরাল হতে চেষ্টা করছেন। যারা মানবসেবার নামে মূলত মানুষের অপমানই করে থাকেন।
ইদানীং অশ্লীল কুইজে ছেয়ে গেছে সোশ্যাল মিডিয়া। এরপর আবার এআই দিয়ে তৈরি শিশুদের স্বামী-স্ত্রী বানিয়ে মুখে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে অশ্লীল সব সংলাপ। এর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে শিশুরা, যার বিস্তৃতি সমাজের এবং পরিবারের জন্য অকল্যাণ বয়ে আনছে। সমাজমাধ্যমে যেহেতু কোনো সম্পাদক নেই, তাই যা ইচ্ছা তা-ই শেয়ার করা যায়। তবে কোনো কিছু শেয়ার করার আগে বিবেকবুদ্ধির আশ্রয় নিয়ে ভাবা উচিত-কোনটা শেয়ার করবে, কোনটা করবে না।
ভাইরালের ভালো দিকও রয়েছে। অনেক অজানা তথ্য, ছবি, গল্প, চমৎকার সব মনীষীর বাণী, ইতিহাস, প্রকৃতি, দেশবিদেশের নানান ভাইরাল তথ্য আমাদের অনেক কিছু শেখায়-জানায়। যেমন এক ভাইরাল ভিডিওর কারণে উগান্ডার কুখ্যাত অপরাধী জোসেফ কোনিকে চিনেছিল সারা বিশ্ব। টাইম ম্যাগাজিনের বিবেচনায় সবচেয়ে ভাইরাল ভিডিও হিসেবে উঠে আসে ‘কোনি ২০১২’-এর নাম। অন্যদিকে ভাইরাল হওয়া সংস্কৃতিতে আরও অনেক ভালো বিষয় রয়েছে। অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের শুভ উদ্যোগ এবং কল্যাণমুখী কাজ অনেককেই উদ্বুদ্ধ করে।
যেমন মানবিক কাজ, শিক্ষামূলক কাজ, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, তথ্যসমৃদ্ধ বিভিন্ন কনটেন্ট, দেশবিদেশের অজানা গল্পকথা, সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যা মানুষকে উৎসাহিত করে ভালো কাজ করতে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ভিডিও বা ফোনালাপ ফাঁস, অশ্লীলতার প্রচার, প্রতারণা, প্রলোভন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত; এসব বিষয় ভাইরাল হওয়া সমাজের জন্য ক্ষতিকর ও অকল্যাণকর।
ইদানীং জ্ঞানী-গুণী, যোগ্য-দক্ষ, উচ্চশিক্ষিত হওয়া নয়; সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর একটি সম্প্রদায় তৈরি হয়েছে। যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে আলোচিত হওয়া, বিখ্যাত হওয়া আর এজন্য ভাইরাল হওয়া। তবে ভাইরাল হওয়া মানে ইতিবাচক কিছু নয়। অনেক সময় গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যও ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে সমাজকে বিষাক্ত করে তোলে। ভাইরাল থেকে জন্ম নেয় তথ্য মহামারি। জৈবিক ভাইরাসের চেয়েও বিপজ্জনক হলো ভুল তথ্যের ভাইরাল হওয়া। একটি মিথ্যা সংবাদ মুহূর্তেই দাঙ্গা, আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এর কারণে মানুষ তার ব্যক্তিজীবন ও গোপনীয়তা হারাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, ভাইরাস ও ভাইরালের মধ্যে একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে।
একটি ছড়ায় কোষ থেকে কোষে, আর ডিজিটাল ভাইরাস ছড়ায় স্ক্রিন থেকে স্ক্রিনে। ইন্টারনেটের এই যুগে ভাইরাল হওয়া যেন নতুন এক আসক্তি। একটি কথা বা একটি ছবি মুহূর্তের মধ্যে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তাকে বলা হয় ইনফরমেশনাল ভাইরাস। এটা যদি কোনো ভালো বা মানবিক কাজ হয়, তাহলে ছড়িয়ে পড়লে তা মানুষের উপকারে আসে। আর গুজব, ঘৃণা বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়লে তা ভাইরাসের মতোই বিষ ছড়ায়, যা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে যেমন টিকার প্রয়োজন, তেমন ক্ষতিকর ভাইরাল ট্রেন্ড থেকে বাঁচতে প্রয়োজন ‘সচেতনতার টিকা’। কোনো কিছু শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা এবং কোনো কনটেন্ট মানসিকভাবে ক্ষতিকর কি না তা বিচার করা অত্যন্ত জরুরি। তাই ভাইরাল হওয়ার মোহে অন্ধ না হয়ে এবং ভাইরাসের ভয়ে কুঁকড়ে না থেকে সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। সুস্থ শরীর এবং সুস্থ মস্তিষ্কের মেলবন্ধনেই গড়ে উঠবে ভাইরাসমুক্ত এক সুন্দর ভবিষ্যৎ।
একটা কথা মনে রাখতে হবে, ভাইরাল নিয়ে যে যতই তর্জনগর্জন করুন না কেন, সাময়িকভাবে এসব কনটেন্ট অর্থ এনে দিলেও এগুলোর স্থায়িত্ব কম। কত ভাইরাল এলো-গেল কিন্তু যেসব ছবি, নাটক, গল্প বা কনটেন্টের আবেদন এখনো আছে, সেগুলো কিন্তু ভাইরাল মানদণ্ডে বিবেচিত নয়।
ভাইরাল হওয়া ভালো, যদি তা সমাজবান্ধব বা মানবকল্যাণে সহায়ক ভূমিকা রাখে, সময়কে ধরে রেখে মানুষের নীতি-নৈতিকতা জাগিয়ে তোলে, মানুষকে সুস্থ বিনোদন দেয়, মনকে প্রফুল্ল রাখে। ভাইরাল হওয়া অপ্রীতিকর, অশ্লীল, অকল্যাণকর ও অসামাজিক সব ধরনের লেখা, ছবি, অডিও এবং ভিডিওর কুপ্রভাব থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এ ধরনের সবকিছু সরাসরি বর্জন করা উচিত।
লেখক: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব
