গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা

- Advertisements -

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল: গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থা ও মানবাধিকার সুনিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যম গণতন্ত্রের সদা জাগ্রত প্রহরী। কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে, গণতন্ত্রের মর্যাদা লুন্ঠিত হলে, কিংবা গণতন্ত্রের পবিত্রতা কোন কারণে কলুষিত হলে, গণমাধ্যমের নির্ভিক কন্ঠ সেখানে সোচ্চার হয়ে উঠে। গণমাধ্যম তাই জনগণের পবিত্র গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণে সর্বদা দায়িত্বশীল অভিভাবক। গণমাধ্যম জনগণকে সচেতন করতে সদা সচেষ্ট এবং জনগণ ও সরকারের মধ্যে গণমাধ্যম সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। জনসাধারণের মতামত/চিঠিপত্র প্রভৃতি প্রকাশের মাধ্যমে জাগ্রত জনমতকে প্রতিফলিত করে সংবাদপত্র পালন করে তার পবিত্র নৈতিক দায়িত্ব। তাই বলা হয় “It is the Peoples Parliament always sessions    ” মন্তব্যটি সর্বোতভাবে স্বার্থক। সংবাদপত্র আক্ষরিক অর্থেই সদা জাগ্রত জাতীয় সংসদ।

গণমাধ্যম একটি সমাজ বা জাতির সামগ্রিক জীবনের প্রাত্যহিক দলিল। তাই গণমাধ্যমকে অবশ্যই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে। গণমাধ্যম হতে হবে জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী। জনগণের স্বার্থে গণমাধ্যম যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, তেমনি ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্যে করবে সংগ্রাম। গণমাধ্যমকে নির্ভীক ও অকপট হতে হবে। আমাদের দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আশানুরুপ নয়। ক্ষমতাসীন প্রতিটি সরকারই স্বীয় দলের স্বার্থে গণমাধ্যমের উপর আধিপত্য বিস্তারের অপচেষ্টায় লিপ্ত থেকে বারবার গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘ ৫৫ বছরেও গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম কোনটাই শক্তিশালী হতে পারেনি। দেশে বারবার সামরিক অভ্যুত্থান, হত্যা, রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী দেশী ও বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের তৎপরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, যুব সমাজের মধ্যে সৃষ্ট হতাশা, বেকারত্ব, জনস্ফীতি, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, ঘুষ-দুর্নীতি, দলীয়করণ ইত্যাদি অবক্ষয় স্বাধীনতার মুল লক্ষ্য গণতন্ত্র, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারকে বিপন্ন করে চলেছে। দেশের সবক্ষেত্রেই ব্যবসায়িক মানসিকতা বিদ্যমান। তোষামোদ, সুবিধাবাদিতা আর মিথ্যাচার সুবিধাভোগী সমাজকে স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার শিখরে নিয়ে যাচ্ছে। বেশীর ভাগ গণমাধ্যম গণমানুষের মুখপত্র না হয়ে সুবিধাবাদী তল্পিবাহক, দুর্বৃত্ত রাজনৈতিক গোষ্ঠির ক্ষমতারোহন কিংবা ক্ষমতাকে পাকাপোক্তকরণের হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।

দেশের গণতন্ত্র দুর্বল থাকলে চেষ্টা করলেও গণমাধ্যম শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে না। কোন সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম অথবা গণমাধ্যমকর্মী সমাজে ন্যায় বিচার, আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষার আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলেই নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তবে শত ঝুঁকির পরেও গণমাধ্যম তাদের দায়িত্ব, সততা, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার সাথে পালন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর দেশের গণমাধ্যম ও তার কর্মীরা যত দলনিরপেক্ষ, নির্ভীক, শিক্ষিত ও সৎ হবেন, ততই দেশের জন্য মঙ্গলজনক।

গণতন্ত্র বলতে জনসাধারণের শাসন ব্যবস্থাকে বুঝায়। যে শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে তাকে গণতন্ত্র বলে। গণতন্ত্র অর্থ জনসাধারণের শাসন। জনগণ যখন সকল ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ভার জনগণের ওপর ন্যস্ত থাকে তখন তাকে গণতন্ত্র বলা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গণতন্ত্রকে রাষ্ট্রের সকলে অংশ গ্রহণ করতে পারে এমন এক ব্যবস্থা বলেছেন। কাজেই বলা যায়, যে সরকার বা শাসন ব্যবস্থায় জনমতের প্রধান্য স্বীকৃত হয় এবং জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালিত হয় তাই গণতন্ত্র। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের একটি জনপ্রিয় সংজ্ঞা দিয়েছেন (Democracy is a Government of the people, by thepeople and for the people ) তাঁর মতে ‘জনসাধারণের জন্য, জনসাধারণের দ্বারা পরিচালিত এবং জনসাধারণেই সরকারই’ হল গণতন্ত্র।

Advertisements

গণতন্ত্র নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করে, ফলে গণতন্ত্রে নাগরিকদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ ও স্বাধীনতা থাকে। গণতন্ত্র আর গণমাধ্যম একটি আরেকটি পরিপূরক। যেখানে গণমাধ্যম যতবেশী শক্তিশালী যেসখানে গণতন্ত্র বেশী শক্তিশালী। পরমত সহিষ্ণুতাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় কথা। আলোচনা, মতপ্রকাশ, ঐক্য, সংহতি হলো গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সিঁড়ি। অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। মৌলিক অধিকার হলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের সংবিধানের ধারার ৩৯(১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে এবং ৩৯ (২) সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে।

গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ, জাতির বিবেক, জনতার কন্ঠস্বর, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ ইত্যাদি নানা নামে গণমাধ্যমকে অভিহিত করা হয়। কিন্তু সেই জাতির বিবেকের উপর চলে নানা জুলুম, অন্যায়-অত্যাচার, গণমাধ্যমকর্মীদের উপর করা হয় নির্যাতন, এমনকি তাদের হত্যা করা হচ্ছে। কিন্তু খুনি ও নির্যাতনকারীরা আইনের আওতায় আসছে না, তাদের শাস্তি হচ্ছে না। এই বিষয়ে সাংবাদিক ইউনিয়ন বা সংগঠনগুলোর ঐক্য প্রয়োজন। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদার জন্যে রাজনৈতিক বিশ্বাসের উর্ধ্বে উঠে সকল সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সাংবাদিকদের পেশাগত ঐক্যের কোন বিকল্প নেই।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা অপরিহার্য। কিন্তু সাংবাদিকগণ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রায় হামলা ও নানা রকম হুমকীতে শিকার হতে হয়। গত ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নিজ বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি ও মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার। নিহতদ্বয় স্বামী-স্ত্রী। ছয় বছর বয়সী একমাত্র শিশু পুত্র মাহির সরোয়ার মেঘের সম্মুখে এই সাংবাদিক দম্পত্তি খুন হয়েছেন। কিন্তু আজো খুনীদেরকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরতে পারেনি, কিংবা চিহ্নিত করতে পারেনি। ২০১১ সালের ২৮ জানুয়ারি পল্টনের নিজ বাসায় খুন হন দৈনিক জনতার সহ-সম্পাদক ফরহাদ খাঁ ও তাঁর স্ত্রী রহিমা খাতুন।

সমপ্রতি প্রকাশিত রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বা আরএসএফ এর প্রতিবেদনে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে এবার বাংলাদেশের তিন ধাপ অবনতি হয়েছে। এ বছর বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম, গত বছর এই অবস্থান ছিল ১৪৯তম। তেসোরা মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এ বছরও ‘বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক’ প্রকাশ করেছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বা আরএসএফ। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, অধিকার ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক এই সংগঠনের সূচক অনুযায়ী ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে এবং গত বছরের চেয়ে পিছিয়েছে তিন ধাপ। আরএসএফএর তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকের ইতিহাসে প্রথমবারের মত অর্ধেকেরও বেশি দেশ ‘কঠিন’ অথবা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে যুক্ত হয়েছে।

Advertisements

সংগঠনটি বলেছে, গত ২৫ বছরের মধ্যে সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের গড় স্কোর এর আগে কখনো এত নিচে নামেনি। আরএসএফ তাদের বিশ্লেষণে বলছে, ২০০১ সাল থেকে ক্রমেই কড়াকড়ি হয়ে ওঠা আইনি ব্যবস্থার বিস্তার বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে যুক্ত আইনগুলো ধীরে ধীরে তথ্য জানার অধিকারকে ক্ষয় করে যাচ্ছে। এমনকি গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও এটা ঘটছে। আরএসএফ প্রতিবছর একটি সূচক প্রকাশ করে যেখানে দেখার চেষ্টা করা হয়, সাংবাদিকরা কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছেন। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এবং নিরাপত্তা– এই পাঁচটি দিক থেকে প্রতিটি দেশ বা অঞ্চলের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বাস্তব পরিস্থিতি ও বিভিন্ন জটিলতা উঠে আসে বলে আরএসএফ দাবি করে। গতবছর ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৪৯ তম অবস্থানে ছিল, যেখানে এবার তিন ধাপ পিছিয়ে ১৫২তম অবস্থানে রয়েছে দেশটি।

দেশে শক্তিশালী গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম কর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে এবং রাজনৈতিক অপব্যবহার তুলে ধরতে পারে। কিন্তু যদি গণমাধ্যম দলীয় প্রভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে সত্য চাপা পড়ে যায় এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি আরও শক্তিশালী হয়। ফলে গণমাধ্যমকে সর্বদা সততা, বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে কাজ করতে হবে। শক্তিশালী ও টেকসই গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বস্তুনিষ্ঠ গণমাধ্যম, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা অপরিহার্য।

লেখক পরিচিত:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি
৭০ কাকরাইল, ঢাকা।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/ytoo
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন