ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণ ও উত্তরণের উপায়

- Advertisements -

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আজ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও দ্রুত বর্ধনশীল মহানগরী। দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু এই শহরে প্রতিদিন লাখো মানুষ জীবিকার সন্ধানে ছুটে আসে। কিন্তু জনসংখ্যার অস্বাভাবিক চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়নের নেতিবাচক প্রভাব এবং পরিবেশ সংরক্ষণে দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে ঢাকা আজ ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের কবলে পড়েছে। বায়ু, পানি, শব্দ, মাটি ও বর্জ্য দূষণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটি নগরবাসীর স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একসময় সবুজে ঘেরা, নদীবেষ্টিত এবং নির্মল পরিবেশের জন্য পরিচিত ঢাকা আজ ধুলো, ধোঁয়া, যানজট, শব্দদূষণ এবং বর্জ্যের শহরে পরিণত হয়েছে। পরিবেশ দূষণের ফলে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, ক্যানসার, মানসিক চাপসহ নানা জটিল রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণের কারণ, এর ভয়াবহ প্রভাব এবং উত্তরণের কার্যকর উপায় নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এখনই।

বর্তমান সময়ে ঢাকা বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় প্রায়ই উপরের দিকে অবস্থান করে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে বায়ুদূষণ এমন মাত্রায় পৌঁছে যে সাধারণ মানুষের জন্য বাইরে চলাফেরা করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।শহরের রাস্তাঘাট, নির্মাণকাজ, পুরনো যানবাহন, ও শিল্পকারখানার কালো ধোঁয়া পরিবেশকে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত করে তুলছে। অন্যদিকে খাল, নদী ও জলাশয়গুলো শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি ময়লার কারণে মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। শব্দদূষণও নগরজীবনের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনসংখ্যার তুলনায় পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা না থাকায় নগরীর তাপমাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবও ঢাকাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

ঢাকা শহরের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিবেশগত সমস্যা হলো বায়ুদূষণ। প্রতিদিন কোটি কোটি ক্ষুদ্র ধূলিকণা ও বিষাক্ত গ্যাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। বায়ুদূষণের প্রধান কারণগুলো হলো-অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, রাস্তার ধুলাবালি, পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, শিল্পকারখানার ধোঁয়া, আবর্জনা পোড়ানো ও ডিজেলচালিত যানবাহনের ধোঁয়া। বায়ুদূষণের ফলে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের সংক্রমণ, হৃদরোগ এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একসময় ঢাকার চারপাশের নদীগুলো ছিল জীবন্ত ও প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। বর্তমানে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী শিল্পবর্জ্য ও মানবসৃষ্ট দূষণের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। পাশাপাশি গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন ও নর্দমার পানি সরাসরি জলাশয়ে গিয়ে মিশছে। পানিদূষণের কারণে মাছ ও জলজ প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে, পানিবাহিত রোগ বাড়ছে, ভূগর্ভস্থ পানির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

Advertisements

ঢাকা শহরে শব্দদূষণ এখন এক ভয়াবহ সমস্যা। যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজ, মাইকিং, জেনারেটর এবং বিভিন্ন যান্ত্রিক শব্দ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত শব্দদূষণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এর ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়, উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়, অনিদ্রা বৃদ্ধি পায়, মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয় ও কর্মক্ষমতা কমে যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আশপাশেও শব্দদূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক।

প্রতিদিন ঢাকা শহরে হাজার হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর একটি বড় অংশ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয় না। রাস্তার পাশে, খালে, ড্রেনে এবং খোলা জায়গায় ময়লা ফেলার ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ করে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে। বর্জ্য থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত গ্যাস পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এছাড়া খোলা জায়গায় আবর্জনা পোড়ানোর ফলে বায়ুদূষণ আরও বৃদ্ধি পায়।

একটি সুস্থ নগর পরিবেশের জন্য পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকা শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উন্মুক্ত স্থান ও গাছপালা কমে যাচ্ছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বায়ুর মান খারাপ হচ্ছে, জীববৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে ও নগর তাপদ্বীপ (Urban Heat Island) প্রভাব বাড়ছে। আজকের ঢাকা কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রকৃতির উপস্থিতি দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।

পরিবেশ দূষণ শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে না, এটি দেশের অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দূষণজনিত রোগের কারণে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পায়। কর্মক্ষমতা কমে যায়। শিশুদের শিক্ষা এবং মানুষের জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি দূষিত শহর বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণ থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পুরনো ও ধোঁয়াযুক্ত যানবাহন পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে হবে। পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন বৃদ্ধি করতে হবে।
প্রতিটি শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ETP) স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে। অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব বিকল্প জনপ্রিয় করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানো বন্ধ করতে হবে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে নীরব অঞ্চল নিশ্চিত করতে হবে। নগর পরিকল্পনায় সবুজ অঞ্চল সংরক্ষণ করতে হবে। রাস্তার পাশে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং সরকারি জায়গায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। নদী ও খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে। নিয়মিত খনন ও পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। ভবিষ্যৎ নগরায়ণকে পরিবেশবান্ধব করতে হবে। হাঁটার পথ, সাইকেল লেন, উন্মুক্ত পার্ক এবং জলাধার সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

Advertisements

পরিবেশ দূষণ মোকাবিলায় সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দিতে হবে।

শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়। প্রতিটি নাগরিককে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা যাবে না, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে, বৃক্ষরোপণ করতে হবে। পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করতে হবে ও পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনকে উৎসাহিত করতে হবে। সচেতন নাগরিক সমাজই একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলতে পারে।

ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণ আজ একটি জাতীয় উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বায়ু, পানি, শব্দ ও বর্জ্য দূষণের কারণে নগরবাসীর জীবনমান প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে। যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশবিদ, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিবেশ রক্ষা কেবল একটি দায়িত্ব নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক অঙ্গীকার। সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত ঢাকা গড়ার মধ্য দিয়েই টেকসই উন্নয়ন এবং একটি সুন্দর বাংলাদেশ নির্মাণ সম্ভব।

লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি
৭০ কাকরাইল, ঢাকা।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/qkpu
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন