English

28.7 C
Dhaka
রবিবার, আগস্ট ৩১, ২০২৫
- Advertisement -

বাংলাদেশে মৌসুমি ফলভিত্তিক পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা

- Advertisements -

সালাম মাহমুদ: প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। কৃষি ও কৃষকের খুব কাছাকাছি গিয়ে অবকাশযাপনের মধ্য দিয়ে কৃষি সম্পর্কিত বাস্তব জ্ঞান আহরণ ও কৃষি পণ্য ক্রয়ের সুযোগ করাই মৌসুমি ফলভিত্তিক কৃষি পর্যটন। যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র এ ধারণাকে কাজে লাগিয়ে তাদের কৃষিখাত ও পর্যটন খাতকে ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ করছে। কৃষি পর্যটন এমনি এক খাত যেখানে একজন কৃষক তার ফসল উৎপাদন ছাড়াও আবাসস্থল এবং শস্যক্ষেত্রকে পর্যটন বান্ধব করে সারা বছরেই আয়ের উৎসতে পরিণত করতে পারেন।

বাংলাদেশে কৃষি পর্যটন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতি কাঠামোতে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং কৃষি সম্প্রসারণ নীতিমালা ২০২০, কৃষি পর্যটনকে উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছে। আমাদের দেশের জিডিপির প্রায় ১৪.১০ শতাংশ কৃষিক্ষেত্র থেকে আসে। কৃষিক্ষেত্রগুলোকে পর্যটনের আওতায় আনতে পারলে বিদ্যমান কৃষিতে অতিরিক্ত উপার্জনমুলক কার্যক্রম যুক্ত হবে। জাতীয় জিডিপিতে কৃষির অবদান বাড়বে বিশ্ব ট্যুর মার্কেটে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বের মাত্রা ১.০৯ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে, কৃষি ও কৃষক অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি লাভকরবে।

বাংলাদেশের প্রত্যেকটা গ্রামেই ট্যুরিস্টদের জন্য আকর্ষণীয় সেখানে আছে মাছ ধরার জায়গা, ফসলের জমি, গরু-ছাগলের পাল। প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে থেকে বাংলাদেশের বেশিরভাগ পর্যটক ভ্রমণগুলো উপভোগ করতে চায়। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে এবং শ্রমশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ গ্রামে বাস করে। সুপরিকল্পিতভাবে এই বিশাল শ্রমশক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে গ্রামীণ অর্থনীতির সমৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্ব ট্যুর মার্কেটে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করা সম্ভব। বাংলাদেশে মূলত প্রায় সব সুস্বাদু, রসালো, পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ, ফল পাওয়া যায়। বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন প্রকারের মৌসুমী ফল পাওয়া যায়। মৌসুমী ফল বছরে অন্য সময় পাওয়া যায় না তাই ক্রেতাদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে এই ফলগুলো।

যেসব ফল সারা বছর পাওয়া যায় না, নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে পাওয়া যায় তাকে মৌসুমী ফল বলে। ষড়ঋতুর এই বাংলায় গ্রীষ্মকালে সবচেয়ে বেশি মৌসুমী ফল পাওয়া যায়। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুর ঘ্রাণে চারপাশ ভয়ে ওঠে মধুমাস জৈষ্ঠ্য। ২০০৯ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট ফলের চাহিদা প্রায় ১১৬.৮০ লক্ষ মেট্রিক টন।। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকার ফলের চাষাবাদ হলেও মোট উৎপাদনের সিংহভাগ (৭৭%) আম, কলা, কাঁঠাল, তরমুজ, পেয়ারা এবং আনারস থেকে আসে। ২০২০-২১ অর্থবছরের দেশে প্রায় ৭ লক্ষ ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ১ কোটি ২২ লক্ষ মেট্রিক টন ফল উৎপাদিত হয়েছে যার বেশিরভাগই মৌসুমী ফল। (তথ্য: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো)।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষ গ্রন্থ ২০২১ এর তথ্য মতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে আম চাষাবাদের আওতাধীন জমির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৮৬ হাজার একর এবং উৎপাদন ১২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। জাতিসংঘের এফ.এ.ও-এর তথ্য মতে, বাংলাদেশ ১৮ বছর ধরে গড়ে ১১.৫ হারে ফলন উৎপাদন বাড়ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে মোট ফসলভিত্তিক আয়ের ১০% ফল থেকে আসে। দেশে চাষযোগ্য জমির মধ্যে ফলের আওতায় আছে মাত্র ১-২ শতাংশ জমি। বিশ্বে উৎপাদিত ফলের মধ্যে বাংলাদেশের লিচুর অবস্থান ২য়, কাঁঠাল ২য়, আম ৭ম, পেয়ারা ৮ম, পেঁপে ১৪ তম।

বাংলাদেশের দিনাজপুরের লিচু বেশ বিখ্যাত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, মোটামুটিভাবে দেশের সব অঞ্চলেই লিচু উৎপাদন হয় তবে আবহাওয়া ও মাটির গুণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে দিনাজপুরে লিচু চাষ জনপ্রিয়। এই জেলার প্রায় প্রত্যেকটি উপজেলায় লিচু চাষ হয়। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় তিন হাজারের বেশি লিচু বাগান আছে। লিচুর বৈজ্ঞানিক নাম খরঃপযর ঈযরহবহংরং। এটি দক্ষিণ-পূর্ব চীনের কুয়াংতুং এবং ফুসিয়েন প্রদেশের বিশ্বমণ্ডলীয় অঞ্চলের স্থানীয় উদ্ভিদ। লিচু বাগানগুলোতে ভ্রমণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা সম্ভব ভেজালমুক্ত সুস্বাদু লিচু একইসঙ্গে শহুরে জীবনে গরম, শারীরিক ও মানসিক অবসাদে শান্তির পরশ তুলিয়ে দিতে পারে লিচু বাগান।

এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে জুন মাস পর্যন্ত পর্যটকের ভ্রমণ পিপাসা মেটাতে পারে এই লিচুবাগানগুলো। লিচু গাছে যখন মুকুল আসে বাগানগুলো যেন মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে দেয় প্রকৃতিতে। ভ্রমণপিপাসু ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মন নিমিষেই চাঙ্গা করে দিতে পারে এই অতুলনীয় গন্ধ। মনে হবে যেন বুক ভরে শ্বাস নেই ও মুকুলের গন্ধে সঁপে দেই নিজেকে। মুকুল থেকে লিচু যখন ফলে পরিণত হয় তখন যেন নিমিষেই রূপ পরিবর্তন করে ফেলে বাগানগুলো। চোখ জুড়ানো সবুজের সমারহ ফুটে ওঠে লিচু বাগানগুলোতে। আর যখন লিচুতে পাক আসে পুরো বাগানের ফলগুলো তখন লালছে গোলাপি বর্ণ ধারণ করে। এ সময় অন্য রূপে সাঝ নেয় লিচু বাগানগুলো। এই অপরূপ রূপের পরিবর্তন দেখার মাঝে আলাদা প্রশান্তি অনুভব করতে পারবে পর্যটকেরা। তাই ভ্রমণপিপাসু প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের জন্য লিচুবাগান ভ্রমণ থাকতে পারে পছন্দের তালিকায়।

বিশ্ব বিখ্যাত হাঁড়িভাঙ্গা আমবাগান হতে পারে পর্যটকদের ভ্রমণের পছন্দের স্থান। রংপুরের মিঠাপুকুরে ঘোড়াগাছের তেকানী গ্রাম থেকে সারা দেশব্যাপী পরিচিতি পাওয়া হাঁড়িভাঙ্গা আম সবার পছন্দের তালিকা। একটি মাত্র মা গাছ থেকে সারা রংপুরে ছড়িয়ে পড়া আমবাগানগুলো হতে পারে প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণপিপাসুদের।
পাইকার নফল উদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এই আমের জাতটি। প্রচলিত আছে মূল গাছটি লাগানোর সময় তিনি পানি প্রদানের সুবিধার জন্য মাটির হাঁড়ি দিয়ে ফিন্টার বানান। মাটির হাঁড়িটি ভেঙে যাওয়াকে কেন্দ্র করে এই নতুন জাতটির নামকরণ করা হয় হাঁড়িভাঙ্গা। মাঘ ও ফাল্গুন মাসে হাঁড়িভাঙ্গা আম গাছে মুকুল আসে। এ সময় বাংলার প্রকৃতিতে বিরাজ করে ঋতুরাজ বসন্ত। প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকেরা ঋতুরাজে রূপের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হতে পারেন হাঁড়িভাঙ্গা আমের সঙ্গে।

বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যে আবহ সৃষ্টি করে তা ভ্রমণকারীদের ভ্রমণ আনন্দকে বৃদ্ধি করবে। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, প্রায় প্রতি বছর ১৮৮৭ হেক্টর জমিতে এই আমের চাষ হয়। পর্যটক হাঁড়িভাঙ্গা আম বাগান ভ্রমণের মাধ্যমে এই আম সংগ্রহ করতে পারে নিশ্চিন্তে। নফল উদ্দিন পাইকার ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই হাঁড়িমাঙ্গা আমের মাতৃগাছটির ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে বংপুরের মিঠাপুকুরের খোরকগাছের তেকানী গ্রামে। একটি মাত্র মা গাছ থেকে হাজার হাজার কলম তৈরি করে হাঁড়িভাঙ্গার বীজ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই মাতৃগাছটি পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণের মাধ্যম হতে পারে।

আনারসের রাজধানী বলে খ্যাত টাঙ্গাইলের মধুপুর আনারস বাগান। ইতিহাস থেকে জানা যায় মধুপুরের আদিবাসী ইদিরপুর গ্রামের গারো ভেরেনো সাংমা ষাটের দশকে ভারতের মেঘালয় থেকে জায়ান্ট কিউ জাতের আনারস এনে এখানে চাষাবাদ শুরু করেন। জুলাই-আগস্ট এই দুই মাসের আনারসের মৌসুম ধরা হয়। মৌসুমী পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে আনারস বাগান ও মধুপুর। আনারস বাগান যেমন পর্যটকদের আগ্রহে থাকবে ঠিক তেমনি আনারসের হাট দেখে বিভিন্ন প্রজাতির আনারস সম্বন্ধে জানতে পারবে। সকালে ভোরের আলোর সঙ্গে পর্যটককে মুগ্ধ করবে আনারস চাষিদের হাটে আগমনের দৃশা। কেউ বাইসাইকেল ঝুলিয়ে, কেউ ঘোড়ার গাড়িতে, কেউ ভ্যান, পিক আপ বোঝাই করে সারিবদ্ধভাবে নিয়ে আসছে আনারস।

ওই সময় রাস্তায় ফুটে উঠে যেন নৈসর্গিক দৃশ্য। যেকোনো পর্যটকের ক্লান্তি দূর করে প্রশান্তি নিয়ে আসার মতো দৃশ্য। মধুপুর পর্যটকদের যেমন প্রকৃতির মাঝে ডুবিয়ে দিতে পারে তেমনি আনারস বাগান ও ফলপ্রেমী মানুষের জন্য এই ভ্রমণ হতে পারে তার জীবনের সেরা ভ্রমণগুলোর মধ্যে অন্যতম।

মৌসুমি ফল ও ফলের বাগানকে পর্যটন শিল্পের অন্তর্ভুক্তি করতে বিপণন ও প্রচার খুবই গুরস্থপূর্ণ মাধ্যমে হিসেবে কাজ করবে। মৌসুমি ফলগুলোকে বিপণনের ক্ষেত্রে সৃজনশীল ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করলে পর্যটকের ওই নির্দিষ্ট স্থানভিত্তিক পর্যটনের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। ডিজিটাল মার্কেটিং-এর মাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বিমান ও সমুদ্রবন্দর রেলওয়েতে আর্কষণীয়ভাবে বিজ্ঞাপন প্রচার করা যেতে পারে। এইসব মাধ্যমে আকর্ষণীয়ভাবে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হলে আন্তর্জাতিক ট্যুরিষ্টরা এই স্পটগুলো সম্বন্ধে জানতে পারবে এবং দেশি পর্যটকদের মৌসুমি ফলভিত্তিক পর্যটনের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশে কৃষি অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী ফসল মৌসুমি ফল। ফিলিপাইনসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো। বাংলাদেশেও কৃষিনির্ভর পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। উপযুক্ত পরিকল্পনা এবং তার যথাযথ ব্যবহারেই পর্যটন শিল্প হতে পারে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। এদেশে বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন সুস্বাদু ফল পাওয়া যায় যা বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল হওয়ায় বিদেশিদের নিকট বাংলাদেশের কৃষি পর্যটনের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নিউইয়র্ক টাইমস ২০০৮-এর ভাষ্য মতে, তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল হওয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের ভ্রমণ বিলাসীদের কাছে বাংলাদেশ হতে পারে ইন্দোনেশিয়ার অবকাশ কেন্দ্র বালি অথবা খাইল্যান্ডের চমৎকার বিকল্প। মৌসুমি ফলভিত্তিক বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটলে বহুমুখী ব্যবসায়ির ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। মৌসুমি ফলসমূহ দিয়ে বিভিন্ন রুচিশীল খাবার তৈরি করা যায়।

পাকা আম দিয়ে তৈরি হবে গারে জেলি, আমসন্ন, আম-দইয়ের আইসক্রিম, আমের চাটনিসহ হরেক রকমের খাবার যা পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াবে এবং রপ্তানি করা যাবে বিদেশে। কৃষকদের মধ্যে ফল চাষের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে ও রাজস্ব প্রবাহের উন্নতি ঘটবে।

ফল চাষিদের পারিবারিক আয়সহ অন্য সদস্যদের খামার থেকে অতিরিক্ত উপার্জনের মাধ্যম তৈরি হবে। এছাড়াও মৌসুমি ফলভিত্তিক পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারলে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে এবং বেশকিছু সম্ভাবনাময় খাত তৈরি হবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক গণকণ্ঠ, মহাসচিব, গ্লোবাল এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/0k5r
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ

আল কোরআন ও আল হাদিস

- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন