বাংলাদেশের উন্নয়নে কুয়াকাটা পর্যটন শিল্পের বর্তমান সমস্যা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

- Advertisements -

মোঃ সাইদ হাসান: সাগরকন্যা খ্যাত কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রটি এশিয়া মহাদেশের এক বিরল বৈচিত্রের অধিকারী। কারণ একই স্থানে বসে সুর্যোদয় ও সুর্যাস্থের বিরল দৃশ্য প্রতিটি পর্যটককে শিহরিত ও বিমোহিত করে। বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকত বলতে কক্সবাজার ও কুয়াকাটা এ দুটি সমুদ্র সৈকতকেই বোঝায়। কক্সবাজার পর্যটন শিল্পের সৌন্দর্য একদিকে সমুদ্র ও অন্যদিকে পাহাড়। তার সাথে বিশেষ সৌন্দর্যের অলংকার হিসেবে আছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। দ্বিতীয়ত, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য একদিকে সমুদ্র ও অন্যদিকে ম্যানগ্রোভ গভীর বনাঞ্চল বেষ্টিত সবুজে ঘেরা এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। তার সাথে সৌন্দর্যের অলংকার হিসেবে বিখ্যাত সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ অঞ্চল।

কুয়াকাটার বাস্তবিক অবস্থা হচ্ছে- পর্যটকগণ এ সকল সৌন্দর্য উপভোগ করার প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে- অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ সমস্যা। এসব সমস্যার কারণে উপভোগ্য স্পটগুলো পর্যটকরা যথাযথভাবে দর্শন ও উপভোগ করতে পারেননা। যার ফলে দিন দিন পর্যটকের উপস্থিতি হ্রাস পাচ্ছে। বেসরকারি বড় বড় বিনিয়োগকারীগণ কুয়াকাটায় অতি আগ্রহের সঙ্গে বিনিয়োগ করতে এসে আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিনিয়োগের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। যার কারণে মনোমুগ্ধকর কুয়াকাটা পর্যটন শিল্পের সার্বিক উন্নয়ন আজ থমকে আছে, যার কিছু সমস্যা ও কারণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:-

বেসরকারি বিনিয়োগের কথাই ধরা যাক, একজন বিনিয়োগকারী বা উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে এসে প্রথমে প্রশাসন হতে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের অনুমোদন নিতে হয়। যা একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া হওয়ায় বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। অতঃপর হোটেল-মোটেল নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদন, সে তো এক সোনার হরিণ! বিভিন্ন সংস্থার ছাড়পত্র নিয়ে প্ল্যান ও নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রায় ২/৩ বছর সময় লেগে যায়। বিভিন্ন শর্ত দিয়ে ফাইলগুলো বছরের পর ফেলে রাখা হয়। ফলশ্রুতিতে, বিনিয়োগকারীগণ কুয়াকাটা পর্যটন শিল্পে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। উন্নয়নের শর্ত হচ্ছে, বিভিন্ন প্রক্রিয়া সহজীকরণ করে উদ্যোক্তা/বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলা। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, পর্যটন শিল্পের দ্রুত উন্নয়নের স্বার্থে কক্সবাজার ও কুয়াকাটা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নামে দুটি আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠিত হলেও ইতিমধ্যে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যথাযথ ও স্বয়ংসম্পন্নভাবে উন্নয়নের কাজ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। কিন্তু কুয়াকাটা কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে কুয়াকাটা পায়রা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নামে প্রশাসনিক অনুমোদন পেলেও এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের কোনো দপ্তর এবং জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। ২০১৭সাল হতে কুয়াকাটা মাষ্টারপ্ল্যান অনুমোদন, সরকারি পরিকল্পনায় মেরিন ড্রাইভ ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কোনোপ্রকার উন্নয়ন না হওয়ায় আজ কুয়াকাটা পর্যটন শিল্পের দৈন্য দশার সৃষ্টি হয়েছে। কুয়াকাটা পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সারা পৃথিবীতে পর্যটন শিল্প সে দেশের রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে। এশিয়া অঞ্চলে মুসলিম রাষ্ট্র মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ এবং থাইল্যান্ড এর মতো দেশগুলোতে পর্যটন শিল্পের ভূমিকা সরকারি রাজস্ব আয়ের ৩০%-৮০% অবদান রাখে। সেই হিসেবে বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ, নয়নাভিরাম, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর হওয়া স্বত্বেও এ দেশের পর্যটন শিল্প অনেক পিছিয়ে আছে।
কুয়াটাকার উন্নয়নের প্রাথমিক সমস্যা সমূহ- সমুদ্র সৈকতের বীচকে সংরক্ষিত রাখার জন্য মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডের আদলে স্থায়ী অবকাঠামোর মাধ্যমে বীচ প্রটেকশনের ব্যবস্থা বীচের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সরকারি অবকাঠামো দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

১) বর্তমানে সুন্দরবনের কচিখালী, হিরণ পয়েন্ট ও কটকা মাত্র ৩/৪ ঘন্টা রিভার ক্রুজের মাধ্যমে কুয়াকাটার সাথে সারাবছর যোগাযোগের মাধ্যমে পর্যটকগণ সুন্দরবনের সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়।
২) কুয়াকাটার নিকটবর্তী ফাতরার বন একটি ম্যানগ্রোভ অঞ্চল। বনাঞ্চল উপভোগ করার জন্য সকল পর্যটককে বোটে করে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বোট থেকে নামার জন্য সেখানে একটি পল্টুন না থাকায় পর্যটক বিড়ম্বনার শিকার হয়। তার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন এবং পিকনিক স্পটে বসার ব্যবস্থা, ওয়াশরুমের ব্যবস্থা, বনাঞ্চলের সরু চ্যানেলে হাঁটার কাঁচা রাস্তাগুলো পাকা করে দেওয়া।

৩) আরেকটি স্পট গঙ্গামতি, যেখানে সূর্যোদয় দেখার জন্য সকল পর্যটকগণ যাতায়াত করেন। সেখানে বসার ব্যবস্থা, ওয়াশরুম এবং ক্যানেলটির দুই পাশে ইকো পার্কের ব্যবস্থা করে ক্যানেলে বোটিং এর ব্যবস্থা করা।
এ সকল ছোট-খাটো অবকাঠামোগত উন্নয়নগুলো বর্তমানে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হলে কুয়াটাকায় পর্যটকদের বিনোদনের উপকরণ সৃষ্টি হবে। কুয়াকাটা পৌরসভার ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এ সকল বর্তমান সমস্যার উন্নয়ন দ্রুত বাস্তবায়ন হলেই কুয়াকাটার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশি-বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীগণ কুয়াকাটায় বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। আর তা থেকে সরকার পাবে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয়।
বর্তমান বিশ্বের সাথে উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে পর্যটন শিল্পই হতে পারে একমাত্র উন্নয়নের ধারক ও বাহক। তাই কুয়াকাটা পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের প্রতি সরকার এবং প্রশাসনকে আন্তরিক সু-দৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।

লেখক : স্বত্ত্বাধিকারী, হোটেল মোহনা ইন্টারন্যাশনাল, সেক্রেটারী জেনারেল, কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশন

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/lkmu
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন