আপনারা নিশ্চই অবগত আছেন যে সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবহন সংক্রান্ত বাংলাদেশের প্রথম আইন হচ্ছে ১৯৮৩ সালের Motor Vehicles Ordinance. এই অর্ডিনেন্সে তথা অধ্যাদেশে সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো বিষয়ের ঘাটতি ছিল। ফলে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে নানাবিধ আইনি জটিলতা তৈরী হচ্ছিল। বিষয়টি সমাধানের উদ্দেশ্য সরকারের নীতি নির্ধারকগণ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সকলে মিলে ২০১২ সালে একটি আইনের খসড়া প্রণয়ন করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে সরকার ও সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অংশীজন মিলে সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন’ নামে একটি আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে। তবে আইনের খসড়া চূড়ান্ত হলেও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতায় তখন সেটি পাশ করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ঢাকার শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুইজন শিক্ষার্থী নিহত এবং ১২ জন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনার প্রেক্ষিতে ছাত্র–জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে Motor Vehicles Ordinance 1983 রহিত করার মাধ্যমে ২০১৬ সালে ‘সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন’ নামক খসড়াটিকে ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসের ৮ তারিখে ‘সড়ক পরিবহন আইন– ২০১৮’ নামে প্রণয়ন করা হয়। সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ বাদ দিয়ে ২০১৮ সালে আইনটি প্রণয়ন করা হলেও যথাসময়ে বিধিমালা জারি না হওয়ায় আইনটির প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ, সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ বিধিমালা জারির জন্য সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে এবং জোরালো দাবি উত্থাপন করার প্রেক্ষিতে সরকার ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর তারিখে সড়ক পরিবহন বিধিমালা– ২০২২’ জারি করে। জারিকৃত বিধিমালায় সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি সংক্ষিপ্ত আকারে উল্লেখ থাকায় সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি।
দুর্ঘটনাজনিত কারণে বাংলাদেশে মানুষের নিহত ও আহত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ রোডক্র্যাশ বা সড়ক দুর্ঘটনা, যা অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যখাতে বিশাল চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। দেশে রোডক্র্যাশের তথ্য সংগ্রহ করে এমন সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের (বিআরটিএ, বাংলাদেশ পুলিশ) হিসাব মতে প্রতিবছর দেশে গড়ে প্রায় ৫,০০০ জন মানুষ মারা যায় ও ১০ হাজারের বেশী মানুষ বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয় এবং পঙ্গুত্ব বরণ করে। কিন্তু বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী। রোডক্র্যাশের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ করে এমন সকল প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, প্রতিবছরই রোডক্র্যাশের সংখ্যা ও তাতে হতাহতের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে রোডক্র্যাশে ক্ষয়–ক্ষতি সহনীয় মাত্রায় রাখতে সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজ ক্রমাগত সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসলেও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি হচ্ছেনা।। তাই সড়ক নিরাপত্তায় সংস্কার ভাবনা এখন সময়ের দাবী।
আপনারা জানেন যে ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনটিই দেশেরসড়ক সংশ্লিষ্ট সর্বশেষ আইন। বিশ^ব্যাপী সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম পরিলক্ষিত হলেও বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়টি তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে। কেননা, Decade of action for Road Safety 2021-2030 ও আন্তর্জাতিক বেস্ট প্র্যাকটিস এর সাথে পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশের প্রচলিত সড়ক পরিবহন আইন– ২০১৮ এ বেশকিছু সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
– বর্তমান আইনটিতে মূলত পরিবহন ব্যবস্থার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যাতে প্রচলিত সড়ক ব্যবহারকারীর আচরণগত ঝুঁকিসমূহের (বেপরোয়া গতি, হেলমেট ব্যবহার না করা, মদ্যপ বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ী চালানো, সিটবেল্ট এবং শিশু সুরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা ইত্যাদি) বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
– সড়ক নিরাপত্তার জন্য জাতিসংঘ ঘোষিত Decade of action for Road Safety 2021-2030 তে যে বিষয়গুলো (১. নিরাপদ গতি, ২. নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, ৩. নিরাপদ যানবাহন, ৪. নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং ৫. রোডক্র্যাশ পরবর্তী সাড়া প্রদান ও ব্যবস্থাপনা) গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ও সুপারিশ করা হয়েছে, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে এসকল বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি;
– বর্তমান আইনে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারী যেমন: পথচারী, সাইক্লিস্ট, শিশু এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন/প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত;
– যথাযথ মানদ&ণ্ড অনুসরণ করে রোড ক্র্যাশের তদন্ত করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার বিষয়ে বর্তমান আইনি কাঠামোতে কোন বিধান রাখা হয়নি;
– প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা একটি মন্ত্রণালয় কিংবা একটি দপ্তরের একার কাজ নয়। এতে অনেকগুলো মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের সক্রিয় অংশগ্রহণ যেমন দরকার তেমনি প্রয়োজন লীড এজেন্সী নির্ধারণ করা, যা আইনী কাঠামোর দ্বারা স্বীকৃত হতে হবে। সড়ক পরিবহন আইনি কাঠামোতে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কোন লীড এজেন্সি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশের সড়ক নিরাপদ করতে জাতিসংঘ ঘোষিত “সেফ সিস্টেম এ্যাপ্রোচ” এর মূল ভিত্তি নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন এবং সর্বোপরি সড়ক ব্যবহারকারীকে (বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারী যেমন – পথচারী, সাইক্লিস্ট, নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ইত্যাদি) নিরাপদ করতে সমন্বিত নিরাপদ ব্যবস্থা (যা বাস্তবায়ন করতে বহুমুখী যানবাহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরপাদ সড়ক ব্যবহারকারী ও রোডক্র্যাশ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা) এর সমন্বয়ে একটি পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন” প্রণয়ন অতীব জরুরি।
“সেফ সিস্টেম এ্যাপ্রোচ” এর মূল লক্ষ্য/উদ্দেশ্য হলো এটি নিশ্চিত করা যে মানুষ তথা সড়ক ব্যবহারকারী ভুল করলেও সড়ক ব্যবস্থাপনা এমন হবে যার ফলে মানুষকে তার ভুলের সর্বোচ্চ মাসুল অর্থাৎ মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের শিকার হতে হবে না; এই এ্যাপ্রোচের কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশে^র অনেক দেশ সড়কে মানুষের মৃত্যুর হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমাদের বর্তমান “সড়ক পরিবহন আইন–২০১৮” আইনটির নীতি কাঠামোতে এ ধরনের বিজ্ঞানভিত্তিক উপাদানসমূহ সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত এবং এটি প্রধানত পরিবহন সংক্রান্ত আইন। সেফ সিস্টেম এপ্রোচের আলোকে বাংলাদেশে “সড়ক নিরাপত্তা আইন” প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হলে রোড ক্র্যাশের পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ভিত্তি পাওয়া যাবে ।
এখন আসি একটি পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা দরকার। কারণ
১. রোডক্র্যাশ জনিত মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হার হ্রাস করা,
২. ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৩.৬ অর্জন করতে হলে হতাহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা ও ১১.২ অর্জন প্রয়োজনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা,
৩. ২০২৫ সালের ১৮–২০ ফেব্রুয়ারি মরক্কোর মারাকেশ–এ অনুষ্ঠিত ৪র্থ গ্লোবাল মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্স অন রোড সেফটি–তে বাংলাদেশর প্রতিশ্রুতি (২০২৭ সালের মধ্যে সেফ সিস্টেম এ্যাপ্রোচ এর আলোকে একটি “সড়ক নিরাপত্তা আইন” প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন) বাস্তবায়ন করা।
রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে নিরাপদ সড়ক বিষয়ক আলাদা আইনের প্রস্তাব করছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করি সেফ সিস্টেম এ্যাপ্রোচ এর আলোকে যথাযথ আইন প্রণীত ও বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সড়ক অধিকতর নিরাপদ হবে। এ সকল পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের নির্বাচনী ইশতেহারে নিম্নোক্ত বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অনুরোধ করছিঃ
বাংলাদেশের সকল সড়ক নিরাপদ করার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৩.৬ ও ১১.২ এবং জাতিসংঘের বৈশি^ক পরিকল্পনা ও ৪র্থ গ্লোবাল মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্স অন রোড সেফটি (২০২৫)-এর প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য সেফ সিস্টেম এ্যাপ্রোচের আলোকে একটি সড়ক নিরাপত্তা আইন” প্রণয়ন এবং এর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ আশা করে সড়কে মানুষের প্রাণহানী রোধ বিষয়ক অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সড়ক নিরাপত্তা আইন” প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের দলীয় ইশতেহারে উপরোক্ত বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করবে এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন করবে।
আজ ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ রোজ রবিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি–এর শফিকুল কবির মিলনায়তন–এ রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ– এর আয়োজনে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)- এর রোড সেফটি প্রকল্পের ব্যবস্থাপক জনাব কাজী বোরহান উদ্দিন এর সঞ্চালনায় উক্ত অনুষ্ঠানে কোয়ালিশনের সদস্য সংস্থার প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা হলেন, জনাব ড. মোঃ শরিফুল আলম, কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর, গ্লোবাল হেলথ এডভোকেসি ইনকিউবিটর (জিএইচএআই)
জনাব এম খালিদ মাহমুদ, রোড সেফটি বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ
জনাব রঞ্জন কর্মকার, নির্বাহী পরিচালক, স্টেপস্ টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট
জনাব এএইচএম বজলুর রহমান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)
জনাব ডা: মাহফুজুর রহমান, প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, রোড সেফটি এন্ড ইনজুরি প্রিভেনশন প্রোগ্রাম,ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ।
জনাব মোঃ শরাফত–ই–আলম, প্রকল্প কর্মকর্তা, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি
জনাব শারমিন রহমান, প্রকল্প সমন্বয়কারী, ঢাকা আহছা্নিয়া মিশন
জনাব স্বর্ণিল মন্ডল, প্রজেক্ট অফিসার, রোড সেফটি প্রজেক্ট, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সহ কোয়ালিশনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
