অন্তর্দ্বন্দ্ব পেরিয়ে যেভাবে পিএসজি হলো ইউরোপের পরাশক্তি

- Advertisements -

২০১১ সালের কথা। ফরাসি ফুটবলের এক ঘুমন্ত দানবকে জাগিয়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছিল কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্টস (কিউএসআই)। ক্লাবটির নাম প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। আগের মৌসুমে ফরাসি লিগ ওয়ানে ১৩ নম্বরে থেকে লিগ শেষ করা দলটির দিকে নিয়মিত চোখ রাখছিলেন নাসের আল-খেলাইফি। মনে মনে এক তীব্র ভয় কাজ করছিল তার; বিনিয়োগের পর দলটি আবার দ্বিতীয় বিভাগে নেমে যাবে না তো! তবে সব শঙ্কা উড়িয়ে টিকে যায় প্যারিসের দলটি, সম্পন্ন হয় মালিকানা বদলের চুক্তি।

কিন্তু আজকের যে ইউরোপীয় পরাশক্তি পিএসজিকে ফুটবলবিশ্ব চেনে, দেড় দশক আগের সেই ক্লাবের সাথে তার কোনো মিলই ছিল না। এরপরের সময়টুকুতে পিএসজি এক অবিশ্বাস্য সাংস্কৃতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। টাকা ঢালা হয়েছে অঢেল, একের পর এক তারকা এসেছেন, তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এসেছে ক্লাবের আত্মপরিচয় পুনর্নির্মাণে। আজ শনিবার যখন আর্সেনালের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে মাঠে নামছে পিএসজি, তখন পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায় এক রোমাঞ্চকর পথচলা।

শুরুর বছরগুলোতে পিএসজি ছিল এক গোলকধাঁধা। এক বিশাল প্রতিভার ভাণ্ডার আর ইউরোপের অন্যতম প্রধান রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও তাদের ছিল না কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো, মর্যাদা কিংবা স্থায়িত্ব। আগের দশকে রোনালদিনহো, পাউলেতা বা ম্যাকলেলের মতো তারকারা খেললেও ইউরোপের শীর্ষ মঞ্চে নিজেদের প্রাসঙ্গিক প্রমাণ করাটাই ছিল প্রথম চ্যালেঞ্জ। প্রথম পাঁচ বছর তো স্টেডিয়ামে উগ্র সমর্থকদের মারামারির নিষেধাজ্ঞার কারণে মাঠের আবহ তৈরি করতেই ধুঁকতে হয়েছিল তাদের। সেই সংকট কাটাতে কিউএসআই বেছে নেয় আগ্রাসী অর্থায়নের পথ। সমালোচকরা একে ‘ব্লিং-ব্লিং’ বা চাকচিক্যের যুগ বললেও পিএসজির কাছে এটিই ছিল শীর্ষে ওঠার সবচেয়ে দ্রুততম রাস্তা। আর এই পথেই দলে ভেড়ানো হয় জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচসংক্ষিপ্ত ইউআরএল ইব্রাহিমোভিচ, নেইমার, কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং লিওনেল মেসির মতো বিশ্বসেরা সুপারস্টারদের।

Advertisements

তারকাদের এই সমাগম তাদের ঘরোয়া লিগে আধিপত্য এনে দিলেও ক্লাবের ভেতরে তৈরি করেছিল এক বিষাক্ত পরিবেশ। ড্রেসিংরুমের নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছিল তারকাদের হাতে। অনুশীলনের সূচি থেকে শুরু করে পেনাল্টি কে নেবেন; এমন সব তুচ্ছ বিষয়েও শুরু হতো দ্বন্দ্ব। এমনকি কিংবদন্তি বাস্কেটবল তারকা কোবি ব্রায়ান্ট যখন ক্লাবের অনুশীলনে এসেছিলেন, তখন তৎকালীন কোচ উনাই ইমেরির বিশ্রামের নির্দেশ অমান্য করে নেইমার ও এমবাপ্পে নিজেদের মতো করে অনুশীলনে মেতে উঠতে চেয়েছিলেন। এই যুগে ব্র্যান্ড হিসেবে পিএসজি বড় হলেও তারকা-নির্ভর মডেলের সীমাবদ্ধতাগুলো প্রকট হয়ে উঠেছিল।

এই সংকটের পরই প্রেসিডেন্ট আল-খেলাইফি ঘোষণা করেন চাকচিক্যের এই যুগের সমাপ্তি। চ্যাম্পিয়নস লিগ কীভাবে জেতা যাবে, সেই ভাবনার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে তারা আসলে কেমন ফুটবল খেলতে চায়। জবাবটা ছিল স্পষ্ট, ফরাসি খেলোয়াড়দের প্রাধান্য দিয়ে আক্রমণাত্মক ফুটবল। আর এই নতুন ভোরের রূপকার হিসেবে নিয়ে আসা হয় লুইস এনরিকেকে। পিএসজির ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো তারকা খেলোয়াড় নয় বরং সবার আগে বেছে নেওয়া হয় ক্লাবের নিজস্ব ফুটবল দর্শন, তারপর কোচ এবং সবশেষে সেই অনুযায়ী স্কোয়াড। মেসি, নেইমার, এমবাপ্পে, রামোসদের মতো মহাতারকাদের বিদায় দেওয়া কোনো শাস্তি ছিল না বরং তা ছিল ক্লাবকে সবার ওপরে রাখার এক কঠিন বার্তা।

লুইস এনরিকে ক্লাবে ফিরিয়ে আনেন কড়া শৃঙ্খলা। গত মৌসুমে আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচের আগে ওসমানে দেম্বেলে মাত্র ১০ মিনিট দেরিতে অনুশীলনে আসায় তাকে দল থেকে বাদ দিতেও দ্বিধা করেননি এনরিকে। যদিও সেই দেম্বেলেই পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। এই কঠোর শৃঙ্খলা খেলোয়াড়দের মানসিকতায় বড় বদল আনে। রেফারিদের সাথে বিতর্ক করা কিংবা মাঠে অযথা নাটকের অবসান ঘটিয়ে পিএসজি হয়ে ওঠে ইউরোপের সবচেয়ে সুশৃঙ্খল দলগুলোর একটি। যেখানে একজন খেলোয়াড়ের ৪০টি গোলের চেয়ে পাঁচজন খেলোয়াড়ের ১০টি করে গোল এনরিকের বেশি পছন্দ, সেখানে চলতি মৌসুমে দলটির হয়ে ২০ জন ভিন্ন ভিন্ন খেলোয়াড় গোল করেছেন। এমনকি গত জানুয়ারিতে চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা কয়েকটি হারের পর ফরাসি মিডিয়া যখন একাধিক নতুন খেলোয়াড় কেনার জন্য চাপ দিচ্ছিল, ক্লাব তখন কোনো প্যানিক বা তাড়াহুড়ো না করে নিজেদের পরিকল্পনায় স্থির ছিল এবং কেবল খভিচা কভারাতসখেলিয়াকে দলে নেয়।

Advertisements

বর্তমান পিএসজির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর নেতৃত্বের একতা। প্রেসিডেন্ট আল-খেলাইফি, স্পোর্টিং ডিরেক্টর লুইস কাম্পোস এবং কোচ লুইস এনরিকে; এই তিন প্রধান ব্যক্তিত্ব এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন, যা অতীতে কল্পনাই করা যেত না। মাঠের ফুটবল সামলাচ্ছেন এনরিকে, দল গোছানোর দায়িত্বে কাম্পোস আর পুরো প্রকল্পের দেখভাল করছেন আল-খেলাইফি। এর পাশাপাশি প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে তৈরি করা নতুন অত্যাধুনিক ট্রেনিং সেন্টার এবং ফরাসি একাডেমির তরুণদের মূল দলে নিয়ে আসার বিষয়টি ক্লাবের পরিচয় বদলে দিয়েছে। চলতি মৌসুমে পিএসজির মূল একাদশের গড় বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর ৩৬৩ দিন, যা ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।

পিএসজি যে এখন বিশ্ব ফুটবলে কতটা প্রভাবশালী, তা স্পষ্ট হয় ইউরোপিয়ান সুপার লিগের বিরুদ্ধে আল-খেলাইফির শক্ত অবস্থান এবং ইউরোপিয়ান ক্লাব অ্যাসোসিয়েশনের নেতা হিসেবে বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদকে পুনরায় মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টার মাধ্যমে। অবশ্য এখনো পিএসজির সামনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তাদের স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা এখনো বেশ কম এবং ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের তুলনায় ফরাসি লিগের টিভি স্বত্বের আয় অনেক পিছিয়ে। যেখানে প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষ দলগুলো টিভি স্বত্ব থেকে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ইউরো পায়, সেখানে পিএসজির আয় মাত্র ৯ মিলিয়ন ইউরোর কাছাকাছি। তবে এই সব সীমাবদ্ধতার মাঝেও একটি জায়গায় পিএসজি এখন অনন্য; কিউএসআই যুগের ইতিহাসে এই প্রথম প্যারিসের ক্লাবটি অন্তত নিশ্চিতভাবে জানে তারা আসলে কী হতে চায় এবং তাদের গন্তব্য কোন দিকে।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/3qo9
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন