কিংবদন্তি বেসবল পিচার নোলান রায়ানের সঙ্গে অদ্ভুত এক মিল রয়েছে মিচেল স্টার্কের। দুজনই বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। ফাইনাল কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তারা জ্বলে ওঠেন। দুজনই এক যুগের বেশি সময় ধরে দুরন্ত গতি ধরে রেখেছেন। তাই বলে তারা শুধু প্রতিভার ওপর ভরসা করে বসে থাকেননি। কঠোর পরিশ্রমে ক্যারিয়ারের শেষ বেলায়ও শরীরকে সেরাটা দেওয়ার মতো করে ফিট রাখছেন। এজন্যই নিজ নিজ খেলায় তারা কিংবদন্তির মর্যাদার পান।
মিচেল স্টার্কের বয়স ৩৬ ছুঁইছুঁই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই বয়সে সাধারণত পেস বোলার দেখা যায় না। দেখা গেলেও তারা মূলত সুইং ও লাইন-লেন্থনির্ভর বোলিংয়ে টিকে থাকেন। কিন্তু সদ্যসমাপ্ত অ্যাশেজে বুড়ো স্টার্ক একা সামলেছেন ইংল্যান্ডকে। অস্ট্রেলিয়ার মূল তিন পেসারের মধ্যে চোটের কারণে যশ হ্যাজেলউড অ্যাশেজে মাঠে নামতে পারেননি। প্যাট কামিন্স খেলেছেন মাত্র একটি টেস্ট। কিন্তু স্টার্ক তাদের অভাব বুঝতে দেননি।
অস্ট্রেলিয়ার ৪-১ ব্যবধানে সিরিজ জয়ের অন্যতম কারিগর বাঁহাতি এ পেসার। ৩১ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাট হাতে ১৫৬ রান করে হয়েছেন সিরিজসেরা। এ যেন কঠোর পরিশ্রমের সোনালি ফসল। এই সিরিজে স্টার্ক শুধু উইকেটই নেননি, বিরামহীনভাবে এক লেন্থে বোলিং করে রান আটকানোর ধৈর্যশীল কাজটাও করেছেন। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের ফলে বোলিংয়ে এমন দুরন্ত নিয়ন্ত্রণ আসে। এর মধ্যে পার্থে অ্যাশেজের প্রথম টেস্টে ৫৮ রানে ৭ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করেন তিনি।
অ্যাশেজজুড়েই দুর্দান্ত বোলিং করেছেন। অনেকের মতে, সময়ের অন্যতম সেরা অস্ত্র তিনি। তবে অবাক করা ব্যাপার হলো, ছেলেবেলায় এই স্টার্ক নাকি উইকেটকিপিং করতেন! ভারতের কোচের চাকরি ছেড়ে গ্রেগ চ্যাপেল ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়া গিয়ে সেন্টার অব এক্সিলেন্সের হেড কোচের দায়িত্বে ফিরে দেখেন এই অবস্থা। তখন একাডেমির কোচ ট্রয় কুলি একঝাঁক তরুণ পেসারকে নিয়ে ভীষণ রোমাঞ্চিত। কুলিই তখন মিচেল স্টার্ককে উইকেটকিপার থেকে পেসারে রূপান্তর করেন।
তিনি তখন যশ হ্যাজেলউড ও জেমস প্যাটিনসনকেও খুঁজে পেয়েছিলেন। তবে উইকেটকিপার থেকে পেসার হওয়ায় শুরুতে অতটা নিখুঁত ছিলেন না স্টার্ক। যে কারণে অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে খুব একটা ম্যাচ খেলার সুযোগ পেতেন না, যেমনটা হ্যাজেলউড ও প্যাটিনসন পেতেন। তবে কুলি প্রায়ই বলতেন, স্টার্কের ওভারের সেরা তিন বলে বিশ্বের সেরা ব্যাটারও চ্যালেঞ্জে পড়ে যাবে। তবে ওভারের বাকি তিনটি বল হতো যাচ্ছেতাই।
মিচেল স্টার্কের উইকেটকিপার থেকে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা পেসার হওয়ার গল্পটা অস্ট্রেলিয়ার ক্রীড়া ইতিহাসেরই একটা দারুণ নির্দশন। তাঁর ভাই ব্রেন্ডন, যে কিনা বিশ্বমানের হাই জাম্পার। কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণও পেয়েছিলেন তিনি। দুই ভাই ছেলেবেলা নাম লিখিয়েছিলেন অ্যাথলেটিকসে। তখন তারা ফুটবলও খেলতেন।
ছেলেবেলায় অ্যাথলেটিকসে কঠোর অনুশীলনের কারণে তাদের মধ্যে যে শক্তিটা সঞ্চারিত হয়েছিল, সেটা বোলিংয়ের সময় দীর্ঘ স্পেলে সহায়তা করেছে। এর পেছনে অবশ্য লোভ সংবরণের ব্যাপারও রয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটকে সবসময়ই সবার উপরে রেখেছেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য আইপিএলের মিলিয়ন ডলারের হাতছানি অবলীলায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। এতে শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে পেরেছেন। বিশ্রামের জন্যই এই বয়সেও কঠোর পরিশ্রম করতে পারছেন, প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতে পারছেন একাই।
