এস এম আজাদ হোসেন: ঈদের আনন্দ মানেই ঘরে ফেরা, প্রিয়জনের সঙ্গে মিলন আর উৎসবের উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রাই যখন বারবার রূপ নেয় মৃত্যুমিছিলে, তখন প্রশ্ন জাগে-আমাদের সড়ক কতটা নিরাপদ? গতকাল রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত কুমিল্লা, ফেনী ও হবিগঞ্জ-এ ঘটে যাওয়া একাধিক দুর্ঘটনায় মোট ১৯ জনের প্রাণহানি এবং গত ২৪ ঘন্টায় ১৫ জেলায় মোট ৩২ জনের প্রাণহানি ও শতাধিক আহতের ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
কুমিল্লায় রেলক্রসিংয়ে বাস ও ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে একসঙ্গে বহু প্রাণ ঝরে যায়। ফেনীতে সড়কে ত্রিমুখী সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটে, আর হবিগঞ্জের মাধবপুরে বাস ও পিকআপের সংঘর্ষে নিভে যায় চারটি জীবন। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এমন ধারাবাহিক দুর্ঘটনা কেবল সংখ্যা নয়-প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, অসংখ্য স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।
এই মর্মান্তিক বাস্তবতা নতুন নয়। গত বছর পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা-এই দুই ঈদকে কেন্দ্র করে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন প্রায় ৭৫০ থেকে ৮০০ জন। আহত হয়েছেন প্রায় ১৭০০ থেকে ১৯০০ জন। শুধু ঈদুল ফিতরেই ৩০০টির বেশি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রায় ৩৫০ থেকে ৩৮০ জন। আর ঈদুল আজহায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ থেকে ৪২০ জনে।
এই পরিসংখ্যান এসেছে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের পর্যবেক্ষণ থেকে, যা স্পষ্টভাবে দেখায়-ঈদ মানেই আমাদের সড়কে বাড়তি ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দুর্ঘটনাগুলোর পেছনে একই কারণ বারবার ফিরে আসে-অতিরিক্ত গতি, ক্লান্ত চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অপরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা এবং দুর্বল তদারকি। ঈদকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ ও দ্রুত পৌঁছানোর মানসিকতা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রতি বছর একই সতর্কবার্তা উচ্চারিত হলেও বাস্তব পরিবর্তন খুবই সীমিত। আইন প্রয়োগে শিথিলতা, সড়কে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং রেলক্রসিংসহ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে আধুনিক নিরাপত্তা না থাকায় দুর্ঘটনা যেন এক ধরনের নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সুরক্ষা বাড়ানো এবং জরুরি সেবার সক্ষমতা উন্নয়ন-এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
ঈদের আনন্দ যেন আর কোনো পরিবারের কান্নায় পরিণত না হয়-এই দায় শুধু সরকারের নয়, বরং সংশ্লিষ্ট সকলের। নইলে প্রতি বছরই নতুন করে যোগ হবে শোকের পরিসংখ্যান, আর সড়ক হয়ে থাকবে এক অনিরাপদ মৃত্যুফাঁদ।
লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,ভাইস-চেয়ারম্যান,-নিরাপদ সড়ক চাই।
