এস এম আজাদ হোসেন: প্রতিবছর ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের সড়কপথে যাত্রীচাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রিয়জনের সঙ্গে উৎসব ভাগাভাগি করতে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে মহাসড়কে। কিন্তু আনন্দের এই যাত্রা অনেক সময় রূপ নেয় আতঙ্কে-দুর্ঘটনা, যানজট, অব্যবস্থাপনা আর অনিয়মের কারণে। তাই ঈদযাত্রা ও ফিরতিযাত্রা নিরাপদ করতে এখনই বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীচাপ বাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যেই গত কয়েকদিনে একাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনায় বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।গতবছর ঈদফিরতি যাত্রায় দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা অনেক ছিল।
চলতি মাসের সবচেয়ে আলোচিত দুর্ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১২ মার্চ বাগেরহাটের রামপাল এলাকায় খুলনা-মংলা মহাসড়কে। একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিয়ের শোভাযাত্রাবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৩ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে নবদম্পতিসহ একই পরিবারের একাধিক সদস্য ছিলেন। এ ঘটনায় আহত হন আরও অন্তত ১৪ থেকে ১৫ জন। আনন্দঘন একটি যাত্রা মুহূর্তেই শোকে পরিণত হওয়ায় ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এরই মধ্যে রেলপথেও ঘটেছে বড় দুর্ঘটনা। ১৮ মার্চ বগুড়ায় একটি ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হলে অন্তত ৬০ জন আহত হন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। এছাড়া নেত্রকোনায় পৃথক ঘটনায় ট্রেনে কাটা পড়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনার সামগ্রিক চিত্রও আশঙ্কাজনক। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসেই দেশে প্রায় ৪৮৭ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এবং ১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।ফেব্রুয়ারি মাসে ৫১৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩২ জন নিহত এবং ১,০৬৮ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি,যা মোট নিহতের প্রায় ৪০.২৭ শতাংশ। এছাড়া পথচারী নিহতের সংখ্যাও উদ্বেগজনক। সেই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ২০ জন প্রাণ হারাচ্ছেন। মার্চ মাসেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
নৌপথে বড় ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও বিচ্ছিন্নভাবে হতাহতের ঘটনা ঘটছে। তবে ঈদকে কেন্দ্র করে লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের প্রবণতা থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন,এসব দুর্ঘটনার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে চালকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা,পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব,ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অনিয়ন্ত্রিত গতি। ঈদযাত্রায় এসব সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঈদের আগে ও পরে সড়ক পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। চালকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল বন্ধ করা, মহাসড়কে নজরদারি জোরদার করা এবং যাত্রীদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
এজন্য সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে চালকদের কর্মপরিবেশে। দীর্ঘসময় টানা গাড়ি চালানো শুধু শারীরিক ক্লান্তিই তৈরি করে না, এটি মনোযোগ কমিয়ে দেয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল করে। ফলে একটি ছোট ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি ট্রিপের আগে পর্যাপ্ত বিশ্রাম বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি। পরিবহন মালিকদের এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
একইসঙ্গে ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়কে নামা বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি জরুরি। ঈদের সময় বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে অনেক অনুপযুক্ত যানবাহন চলাচল শুরু করে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগেভাগেই অভিযান জোরদার করতে হবে।
অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া ও বেপরোয়া গতি-এই দুই সমস্যা প্রায় প্রতি ঈদেই ভয়াবহ চিত্র তৈরি করে। মহাসড়কে কার্যকর মনিটরিং টিম মোতায়েন করে এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। পাশাপাশি পুলিশ ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপস্থিতি বাড়ালে তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা অন্যদের জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
চালক ও সহকারীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও অবহেলা করার সুযোগ নেই। সড়ক নিরাপত্তা, ঝুঁকি মোকাবিলা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দক্ষ চালকই নিরাপদ যাত্রার প্রধান ভিত্তি।
অন্যদিকে দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত চিকিৎসা সেবা পাওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অ্যাম্বুলেন্স ও প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হবে। এতে প্রাণহানির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
যাত্রীদের সচেতনতা বাড়ানোও সমান জরুরি। অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে ওঠা, চালককে তাড়া দেওয়া বা নিয়ম ভাঙায় উৎসাহ দেওয়া-এসব আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার ও ক্যাম্পেইন জোরদার করা গেলে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সবশেষে বাসস্ট্যান্ড ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। যাত্রী ওঠানামার সুষ্ঠু ব্যবস্থা, টিকিটিং নিয়ন্ত্রণ এবং ভিড় ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমবে।
ঈদ মানে আনন্দ, মিলন আর স্বস্তি। এই আনন্দ যেন সড়ক দুর্ঘটনার শোকগাঁথায় পরিণত না হয়, সে দায়িত্ব আমাদের সবার। সরকার, পরিবহন মালিক, চালক ও যাত্রী-সবার সম্মিলিত সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণই পারে একটি নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে। এখন প্রয়োজন শুধু কথার নয়, কার্যকর বাস্তবায়নের।
লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,সাবেক মহাসচিব-নিরাপদ সড়ক চাই।
