এস এম আজাদ হোসেন: বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেন এক অবিরাম দুঃসংবাদ। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সড়কে ঝরে যাচ্ছে মানুষের প্রাণ।১২ মার্চ আবার একসঙ্গে ১৩ জন মানুষের মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল-দেশের সড়ক এখনো কতটা অনিরাপদ। আর এই ঘটনা ঘটল ঠিক এমন এক সময়, যখন সামনে ঈদুল ফিতর। ঈদ মানেই ঘরমুখো মানুষের ঢল। কোটি কোটি মানুষ রাজধানী ও বড় শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাবে প্রিয়জনদের কাছে। কিন্তু এই আনন্দযাত্রা অনেক সময় পরিণত হয় আতঙ্ক ও শোকের যাত্রায়।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা নতুন কোনো সমস্যা নয়। গত দুই দশকে এটি একটি বড় জননিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও বেসরকারি সংস্থার তথ্য বলছে, প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় এবং আরও নিহতের প্রায় তিনগুণ মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করে। এই দুর্ঘটনাগুলোর একটি বড় অংশ ঘটে উৎসবের আগে ও পরে, বিশেষ করে ঈদযাত্রার সময়।
ঈদকে সামনে রেখে এখনই দেশের মহাসড়কগুলোতে যাত্রীচাপ বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট-সব দিকেই যাত্রীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল-সব মিলিয়ে সড়কে তৈরি হয় এক অস্বাভাবিক চাপ। এই চাপের সঙ্গে যখন যুক্ত হয় অব্যবস্থাপনা, বেপরোয়া গতি এবং দুর্বল নজরদারি, তখন দুর্ঘটনা যেন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।
সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো বেপরোয়া গতি। অনেক চালক দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে গিয়ে ট্রাফিক নিয়ম অমান্য করেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, চালকেরা দীর্ঘ সময় বিশ্রাম ছাড়া গাড়ি চালান। ক্লান্তি, ঘুম বা মনোযোগের ঘাটতি তখন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
দ্বিতীয়ত, অনেক যানবাহনই সড়কে চলে অযোগ্য অবস্থায়। ফিটনেস সনদহীন বাস বা ট্রাক প্রায়ই মহাসড়কে দেখা যায়। পুরোনো ব্রেক, ক্ষয়প্রাপ্ত টায়ার বা ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ নিয়েই এসব গাড়ি চলাচল করে। ফলে সামান্য ভুল বা চাপেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, সড়কের অবকাঠামোগত সমস্যাও দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ। অনেক মহাসড়ক এখনো সংকীর্ণ, কোথাও কোথাও গর্ত বা ভাঙা অংশ রয়েছে। আবার অনেক জায়গায় সঠিক সাইনবোর্ড বা সড়কচিহ্ন নেই। রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও অনেক সড়কে অনুপস্থিত। ফলে চালকদের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়ে।
চতুর্থত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা রয়েছে। ঈদের সময় সড়কে অতিরিক্ত যানবাহন চললেও অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সেই অনুযায়ী শক্তিশালী করা হয় না। ফলে কোথাও কোথাও দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। এই যানজট এড়াতে অনেক চালক বিপজ্জনক ওভারটেকিং বা বিপরীত লেনে গাড়ি চালানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করেন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো মোটরসাইকেলের বেপরোয়া ব্যবহার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। অনেক তরুণ চালক যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া রাস্তায় নামেন। হেলমেট ব্যবহার না করা, অতিরিক্ত গতি বা স্টান্ট করার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ঈদের সময় এই সব সমস্যার প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে সবাই দ্রুত বাড়ি পৌঁছাতে চায়। কিন্তু সেই তাড়াহুড়োই অনেক সময় হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী। বাসের ও ট্রেনের ছাদে যাত্রী বহন, অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, অননুমোদিত স্টপেজ-এসব দৃশ্য ঈদযাত্রার সময় প্রায় নিয়মিত হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। অনেক পরিবার ঈদের আনন্দের আগে বা পরে হঠাৎ শোকের সাগরে ডুবে যায়। কোনো পরিবার হারায় তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে, কোনো শিশু হারায় তার বাবা-মাকে। একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণ নেয় না, এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চিত করে দেয়।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে-সমাধান কী? প্রথমত, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোরতা বাড়াতে হবে। ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে অতিরিক্ত গতি, বিপরীত লেনে গাড়ি চালানো এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো জরুরি।
দ্বিতীয়ত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। পেশাদার চালকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চালকদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ক্লান্ত বা ঘুমন্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো যে কতটা বিপজ্জনক, তা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
তৃতীয়ত, সড়ক অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। মহাসড়কগুলোকে আরও প্রশস্ত করা, বিপজ্জনক মোড়ে সিগন্যাল ও সাইনবোর্ড স্থাপন, এবং রাতের আলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
চতুর্থত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। স্পিড ক্যামেরা, সিসিটিভি নজরদারি এবং ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর হতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে এই পদ্ধতিগুলো ইতিমধ্যে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন। নিরাপদ সড়ক শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়,এটি প্রত্যেক নাগরিকেরও দায়িত্ব। চালক, যাত্রী, পথচারী-সবাই যদি নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে অনেক দুর্ঘটনাই এড়ানো সম্ভব।
ঈদ সামনে। কোটি মানুষ সড়কে নামবে। এই সময়ে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য বড় একটি পরীক্ষা। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন-সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। গণমাধ্যমকেও সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
এই ১৩টি প্রাণহানি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে আগামী দিনেও একই ধরনের শোকাবহ সংবাদ আমাদের শুনতে হবে।
ঈদ মানে আনন্দ,মিলন ও ভালোবাসার উৎসব। এই আনন্দ যেন আর কোনো পরিবারের জন্য শোকের কারণ না হয়-সেটাই হওয়া উচিত আমাদের সবার অঙ্গীকার। নিরাপদ সড়ক কেবল একটি দাবি নয়, এটি এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
লেখকঃ কলামিস্ট, সোস্যাল এক্টিভিস্ট, ভাইস-চেয়ারম্যান (সাবেক মহাসচিব)-নিরাপদ সড়ক চাই।
