English

17 C
Dhaka
শনিবার, জানুয়ারি ৩১, ২০২৬
- Advertisement -

নির্বাচনী ইশতেহারে নিরাপদ সড়ক না থাকলে রাষ্ট্রের দায় অপূর্ণই থেকে যাবে

- Advertisements -

এস এম আজাদ হোসেন: বাংলাদেশে উন্নয়ন,প্রবৃদ্ধি ও অগ্রগতির গল্প যতই শোনা যাক না কেন,সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান সেই সব অর্জনের ওপর প্রতিদিন এক নির্মম প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়। উন্নয়ন যদি মানুষের জীবনকে নিরাপদ না করে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা অর্থবহ-সে প্রশ্ন আজ আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ ঝরছে, কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন, পরিবারগুলো এক মুহূর্তে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের নীতি-ব্যর্থতা ও অবহেলার ফল।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন একটি নীরব জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও বেসরকারি সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান এবং আহত হন তার কয়েকগুণ বেশি। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই ক্ষতি ভয়াবহ-জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে যায় চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হারানো ও সামাজিক ক্ষতির মাধ্যমে। অথচ এত বড় একটি সংকট এখনো রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় দৃশ্যমানভাবে জায়গা পায়নি।

এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ। নির্বাচনী ইশতেহার হচ্ছে জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের লিখিত অঙ্গীকার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অতীতের অধিকাংশ ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়টি ছিল হয় উপেক্ষিত, নয়তো অত্যন্ত সাধারণ ও অস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত। ফলাফল হিসেবে সরকার পরিবর্তন হলেও সড়কে মৃত্যুমিছিল থামেনি।
সড়ক নিরাপত্তা কেবল পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একক বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য,আইনশৃঙ্খলা,নগর পরিকল্পনা,শ্রমনীতি এবং মানবাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একজন নাগরিক নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবেন-এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব যদি রাষ্ট্র পালন করতে ব্যর্থ হয়,তবে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়,নৈতিক ব্যর্থতাও বটে।

প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ‘সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার’ হিসেবে ঘোষণা করা জরুরি। এটি কোনো উপ-অধ্যায় বা ছিটেফোঁটা প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়, বরং আলাদা ও স্পষ্ট অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। একই সঙ্গে একটি ‘১০ বছর মেয়াদি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা রোডম্যাপ’ প্রণয়নের অঙ্গীকার থাকতে হবে,যেখানে দুর্ঘটনা কমানোর নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, সময়সীমা ও দায়বদ্ধ সংস্থাগুলোর ভূমিকা নির্ধারিত থাকবে।

বাংলাদেশের পরিবহন খাত দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দখলে রয়েছে-এ কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। রুট পারমিট থেকে শুরু করে শ্রমিক ইউনিয়ন ও মালিক সমিতি পর্যন্ত সর্বত্র ক্ষমতার ছায়া থাকায় আইনের সঠিক প্রয়োগ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও এই অদৃশ্য চাপের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। তাই ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে-পরিবহন খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা হবে এবং এখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে।

চালক প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার দুর্বলতা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। আজও দেশের সড়কে অসংখ্য চালক চলাচল করছেন যাদের নেই মানসম্মত প্রশিক্ষণ, নেই বৈধ লাইসেন্স বা রয়েছে ভুয়া কাগজপত্র। আধুনিক ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন, সম্পূর্ণ ডিজিটাল লাইসেন্সিং ও ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালু এবং পেশাদার চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক রিফ্রেশার কোর্স চালুর অঙ্গীকার ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ইশতেহারে এসব সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে।

একইভাবে,ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়কের নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে। যান্ত্রিক ত্রুটি, ব্রেক ফেল, টায়ার বিস্ফোরণ-এসব দুর্ঘটনার বড় কারণ। অথচ যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নবিদ্ধ। তাই যানবাহন পরীক্ষা ব্যবস্থা (VTS) শতভাগ ডিজিটাল করা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট বয়স অতিক্রম করা যানবাহন ধাপে ধাপে নিষ্ক্রিয় করার প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া জরুরি।

আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরও অনেক ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পার পেয়ে যায়। ফলে বেপরোয়া আচরণ কমে না। এজন্য ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ বাস্তবায়নে বিশেষ সড়ক দুর্ঘটনা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের অঙ্গীকার ইশতেহারে থাকা প্রয়োজন। দ্রুত বিচার ও নিশ্চিত শাস্তি ছাড়া কোনো আইনই কার্যকর হয় না।

অবকাঠামোগত উন্নয়নও সড়ক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক ও নগর এলাকায় বহু ঝুঁকিপূর্ণ স্থান বা ‘ব্ল্যাক স্পট’ চিহ্নিত থাকলেও তা নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না। ইশতেহারে ব্ল্যাক স্পট নির্মূলে আলাদা বাজেট বরাদ্দ, নিরাপদ ফুটপাত,ওভারপাস,আন্ডারপাস ও জেব্রা ক্রসিং বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, গণপরিবহনকেন্দ্রিক নগর পরিকল্পনার অঙ্গীকারও জরুরি।

নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা ছাড়া সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রুট র‍্যাশনালাইজেশন,নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা,পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

দুর্ঘটনার পরবর্তী সময়-বিশেষ করে ‘গোল্ডেন আওয়ার’-প্রাণ রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ মহাসড়কে দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘাটতি প্রকট। ইশতেহারে মহাসড়কে দ্রুত রেসপন্স টিম, জেলা পর্যায়ে ট্রমা সেন্টার এবং একটি রিয়েল-টাইম জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা তথ্যব্যবস্থা চালুর অঙ্গীকার থাকতে হবে।

সবশেষে, শিক্ষা ও সচেতনতা ছাড়া কোনো সংস্কারই টেকসই হয় না। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং গণমাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারে রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন সড়ক নিরাপত্তা কমিশনের মাধ্যমে নিয়মিত মনিটরিং ও অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।
নিরাপদ সড়ক কেবল একটি দাবি নয়; এটি একটি মানবাধিকার,একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং একটি সভ্য রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্ত। আসন্ন নির্বাচনের ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সুস্পষ্ট,সময়বদ্ধ ও বাস্তবভিত্তিক অঙ্গীকারই পারে এই দীর্ঘদিনের অবহেলাকে ইতিহাসে পরিণত করতে। উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যেতে হলে,আগে সেই সড়ককে মানুষের জন্য নিরাপদ করতে হবে-এ সত্য আর উপেক্ষার সুযোগ নেই।

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভস্ট,মহাসচিব-নিরাপদ সড়ক চাই।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/ide8
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন