English

25 C
Dhaka
রবিবার, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬
- Advertisement -

সড়কে নিরাপত্তা কেন প্রয়োজন

- Advertisements -

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল: সুষ্ঠু সড়ক ব্যবস্থা একটি দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও নাগরিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সড়কের ভূমিকা অপরিসীম। নিরাপদ ও সুষ্ঠু সড়ক ব্যবস্থা উন্নয়ন-অগ্রগতির চালিকাশক্তি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে সড়ক আজ অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণ অকালেই ঝরে যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। হাজার হাজার মানুষ পঙ্গু হয়ে সারাজীবনের জন্য অসহায় হয়ে পড়ছে। শুধু মানুষ নয়, একটি দুর্ঘটনা ভেঙে দেয় অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন।জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১.৩ মিলিয়ন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় এবং আরও প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষ আহত হয়।

বাংলাদেশেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ( BBS) ও বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুসারে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। বাস্তব সংখ্যা হয়তো আরও বেশি, কারণ অনেক দুর্ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয় না। এই ভয়াবহ বাস্তবতার কারণে সরকার ২০১৭ সালে ২২ অক্টোবরকে “জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস” হিসেবে ঘোষণা করে। এর লক্ষ্য হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ট্রাফিক আইন মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং নিরাপদ সড়ক গড়ার আন্দোলনকে শক্তিশালী করা।আজকের দিনে সড়ক নিরাপত্তা কেবল ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ছে। তাই “সড়কে নিরাপত্তা কেন জরুরি” প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা নয়, বরং এর বহুমাত্রিক প্রভাব, কারণ এবং প্রতিরোধমূলক কৌশলগুলোও বুঝতে হবে।বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই পরিবহন খাতের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়ে আসছে।

তবে ১৯৯০-এর দশকে যখন দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন এ নিয়ে সামাজিক আন্দোলনের সূচনা ঘটে। ১৯৯৩ সালে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে শুরু হয় “নিরাপদ সড়ক চাই” আন্দোলন। এটি ছিল একটি মাইলফলক। এরপর থেকে জনগণের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা গড়ে ওঠে। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থী, নাগরিক সমাজ, এনজিও এবং পেশাজীবী সংগঠন এ আন্দোলনে যুক্ত হয়। সরকারও এ সময়ে নানা উদ্যোগ নেয়। যেমন: ১৯৯৫ সালে প্রথম জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন করা হয়।  ২০০৪ সালে প্রথম সড়ক নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন করা হয়। ২০১৭ সালে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণা ২০১৮ সালে নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হয়। তবে সমস্যার জায়গা হলোএই নীতি বা আইন অনেক সময় সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের চাপের কারণে সড়ক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিকভাবে দেখলে দেখা যায়, ২০০০ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা ও কার্যক্রম শুরু হয়। জাতিসংঘ ২০১১-২০২০ সালকে ঘোষণা করে  Decade of Action for Road Safety হিসেবে। এর লক্ষ্য ছিল সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার অর্ধেকে নামিয়ে আনা। বাংলাদেশও এর অংশ হলেও প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জিত হয়নি।তবে আশার বিষয় হলো আজকের তরুণ প্রজন্ম এই আন্দোলনে সরব। বিশেষ করে ২০১৮ সালের ছাত্র আন্দোলন পুরো জাতিকে নাড়া দিয়েছিল। তখন শিক্ষার্থীরা “নিরাপদ সড়ক চাই,  We want justice” প্রভৃতি স্লোগান দিয়ে সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে নিরাপদ সড়ক শুধু একটি দাবি নয়, বরং এটি মানুষের মৌলিক অধিকার।

সড়ক দুর্ঘটনায় একেকটি প্রাণ হারানো মানে একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া। একজন কর্মক্ষম মানুষ মারা গেলে বা পঙ্গু হলে তার পরিবারের আর্থিক ভিত্তি নষ্ট হয়ে যায়। বয়স্ক বাবা-মা সন্তান তাদের ভরসার হারায়, সন্তানরা হারায় অভিভাবককে। এভাবে একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারকে চিরস্থায়ী দুঃখে নিমজ্জিত করে।

সামাজিক দৃষ্টিকোণ:প্রতিটি দুর্ঘটনা শুধু ব্যক্তিকে নয়, সমাজকেও আঘাত করে। যখন কোনো বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী দুর্ঘটনায় মারা যায়, তখন পুরো সমাজ শোকাহত হয়। এতে মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। সামাজিক স্থিতিশীলতা কমে যায়, সবাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রতিবছর প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। এটি দেশের মোট জিডিপির প্রায় ২-৩ শতাংশ। সড়ক দুর্ঘটনায় চিকিৎসা খরচ বাড়ে, কর্মক্ষমতার ক্ষতি, যানবাহনের ক্ষতি, উৎপাদনশীলতা হ্রাস সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি বিশাল জাতীয় ক্ষতি।

দুর্ঘটনায় আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। এতে স্বাস্থ্য খাতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। অন্যদিকে, ছাত্রছাত্রীরা সড়কে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করলে শিক্ষার মানে প্রভাব পড়ে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে একা স্কুলে পাঠাতে ভয় পান।

একটি দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার বেশি হলে সেটি বিনিয়োগকারীদের কাছে অনিরাপদ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়। আন্তর্জাতিক পর্যটকরা ভ্রমণে অনাগ্রহী হয়। এর ফলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এবং বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন প্রায় প্রতিদিনের খবর। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলো একক কোনো কারণে নয়, বরং বহু কারণের সমন্বয়ে ঘটে। চালকের অবহেলা ও বেপরোয়া গতি:বাংলাদেশের সড়কে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়া আচরণ। অনেক চালক দীর্ঘ সময় বিশ্রাম ছাড়া গাড়ি চালান, ফলে ক্লান্তির কারণে মনোযোগ নষ্ট হয়। অনেকে প্রতিযোগিতা করে বাস চালান যাত্রী সংগ্রহের জন্য। এতে একে অপরকে ওভারটেক করার সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

ট্রাফিক পুলিশের জরিপে দেখা যায়, অনেক চালক মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালান। ইয়াবা বা গাঁজা খেয়ে জেগে থাকার চেষ্টা করলেও তা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। বাংলাদেশে অনেক চালক বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালান। আবার অনেকে লাইসেন্স পেলেও সঠিক প্রশিক্ষণ পাননি। ফলে ট্রাফিক আইন মানার মানসিকতা গড়ে ওঠে না।

অনেক যানবাহন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া রাস্তায় নামানো হয়। ব্রেক বা চাকার সমস্যা, পুরনো ইঞ্জিন, বাতি না জ্বালানো এসব কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। পরিবহন মালিকরা মুনাফার

জন্য গাড়ি সার্ভিসিং না করে রাস্তায় ছাড়েন।

বাংলাদেশের অনেক রাস্তায় ফুটপাত নেই, নেই সঠিক ট্রাফিক সিগন্যাল। মহাসড়কে হঠাৎ বাজার বসে যায়, স্কুলের সামনে স্পিডব্রেকার নেই। অনেক রাস্তা সংকীর্ণ ও খানাখন্দে ভরা। আইন থাকলেও তার প্রয়োগ শিথিল। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবশালী মালিক-শ্রমিক সংগঠন আইন প্রয়োগে বাধা দেয়। ট্রাফিক পুলিশের মধ্যেও দুর্নীতি আছে। ঘুষ নিয়ে অনেককে ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে চালকরা ভয় পায় না। পথচারীরা হঠাৎ রাস্তা পার হন, ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করেন না। সাইকেল ও রিকশাচালকরাও অনেক সময় উল্টোদিকে চলেন, যা দুর্ঘটনার কারণ হয়।এসব কারণ মিলিয়ে দুর্ঘটনা যেন অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এগুলো প্রতিরোধযোগ্য, যদি আমরা সচেতনতা ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারি। সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা শুধু মৃত্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বহুমাত্রিক পরিণতি আছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০ জন মানুষ মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। প্রতিটি প্রাণ হারানোর পেছনে আছে একটি পরিবার, অসংখ্য স্বপ্ন। দুর্ঘটনায় যারা বেঁচে যান, তাদের অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যান। হাত-পা হারিয়ে কর্মক্ষমতা হারায়। একসময় যিনি পরিবার চালাতেন, তিনি পরিণত হন পরিবারের বোঝায়।পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষতি: একজন দুর্ঘটনায় মারা গেলে বা পঙ্গু হলে তার পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসা খরচ বাড়ে, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। দরিদ্র পরিবার প্রায় ভেঙে পড়ে। বিশ্বব্যাংক হিসাব দিয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ২-৩% ক্ষতি হয়। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি বিরাট ক্ষতি। হাসপাতাল, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও অন্যান্য খাতে রাষ্ট্রকে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হয়। যারা দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন, তারা অনেক সময় মানসিক ট্রমায় ভোগেন। নিহত বা আহতের পরিবার বহু বছর ধরে মানসিক কষ্ট বহন করে। শিশুরা বাবা-মাকে হারালে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। প্রতিটি বড় দুর্ঘটনা সামাজিক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। মানুষ রাস্তায় নামে, আন্দোলন করে। এতে রাজনৈতিক অস্থিরতাও দেখা দেয়। ২০১৮ সালের শিক্ষার্থী আন্দোলন ছিল এর বড় উদাহরণ। সুতরাং, সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। নিরাপদ সড়ক আমার অধিকারএবং তা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব। তাহলেই একদিন আমরা সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব যেখানে সড়ক হবে নিরাপদ, যাত্রা হবে শান্তিপূর্ণ, আর প্রতিটি প্রাণ হবে সুরক্ষিত।

লেখক পরিচিতি: লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)

যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি

যুগ্ম সম্পাদক, নিরাপদ নিউজ ডটকম

৭০ কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

The short URL of the present article is: https://www.nirapadnews.com/tkoz
Notify of
guest
0 মন্তব্য
সবচেয়ে পুরাতন
সবচেয়ে নতুন Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Advertisements
সর্বশেষ
- Advertisements -
এ বিভাগে আরো দেখুন