এস এম আজাদ হোসেন: ঈদের আনন্দ শেষে যখন মানুষ আবার কর্মজীবনে ফিরতে শুরু করে, ঠিক তখনই সড়ক থেকে ভেসে আসে একের পর এক দুর্ঘটনার খবর। কোথাও বাসের ধাক্কায় ঝরে যাচ্ছে প্রাণ, কোথাও মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতিতে থেমে যাচ্ছে তরুণ জীবনের গল্প,কোথাও বাস নেমে যাচ্ছে নদীতে আবার কোথাও ট্রেন ও লঞ্চে ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এই পুনরাবৃত্তি যেন আমাদের জাতীয় বাস্তবতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রশ্নটা আবারও সামনে আসে-শৃঙ্খলা ফিরবে কবে? আমরা কি কখনও নৈরাজ্যের সড়ক থেকে নিরাপত্তার সড়কে ফিরতে পারব?
ঈদকে ঘিরে দেশের সড়কব্যবস্থা প্রতি বছরই বাড়তি চাপের মুখে পড়ে। লক্ষ লক্ষ মানুষ গ্রামমুখী হয়,আবার ছুটে আসে শহরে। এই যাতায়াতের চাপের সঙ্গে যুক্ত হয় অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন,অতিরিক্ত যাত্রী বহন, চালকদের ক্লান্তি এবং তীব্র প্রতিযোগিতামূলক গতি। ফলে সড়ক হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ, আর দুর্ঘটনা যেন অবধারিত পরিণতি।
সংখ্যা বলছে,পরিস্থিতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে ১৫ দিনের যাতায়াত সময়ে অন্তত ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত এবং ৮২৬ জন আহত হন। অন্য এক হিসাবে দেখা যায়,একই সময় প্রায় ৩৯৯টি দুর্ঘটনায় ৪০৭ জন নিহত এবং ১,৩৯৮ জন আহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়-প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন, একটি নিভে যাওয়া ভবিষ্যৎ।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ঈদ-পরবর্তী সময়েও এই চিত্রের খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। বরং ধারাবাহিক কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষ,নদীতে বাস ও লঞ্চ দুর্ঘটনা,ট্রেন দুর্ঘটনা-এসব ঘটনায় একাধিক প্রাণহানি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা এখনও নিরাপদ সড়কের অনেক দূরে। পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান না এলেও সামগ্রিক চিত্র বলছে, ঝুঁকি কমেনি; বরং আগের মতোই রয়ে গেছে, কিছু ক্ষেত্রে আরও বেড়েছে।
জাতীয় পর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক।বেসরকারী পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে সারাদেশে ৬,৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯,১১১ জন নিহত এবং ১৪,৮১২ জন আহত হয়েছেন। এই সংখ্যা শুধু একটি বছরের হিসাব নয়; এটি আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও সড়ক দুর্ঘটনা একটি বড় সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর তথ্য অনুযায়ী,প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়।প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ বিভিন্ন মাত্রায় আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করে। তবে উন্নত দেশগুলো এই সংকট মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তারা দুর্ঘটনার হার অনেকাংশে কমাতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল ও বহুমাত্রিক। এখানে সড়ক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে যানবাহনের ফিটনেস সংকট, লাইসেন্স প্রদান ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগের ঘাটতি। অনেক চালক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই সড়কে নামছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আইন ভাঙলেও শাস্তি নিশ্চিত হয় না। ফলে তৈরি হয় দায়মুক্তির সংস্কৃতি, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
চালকদের আচরণও বড় একটি কারণ। অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, মোবাইল ফোন ব্যবহার, এমনকি ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো-এসবই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। ঈদের সময় এই প্রবণতা আরও বেড়ে যায়, কারণ দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়না তখন সবচেয়ে বেশি থাকে।
তবে শুধু চালক বা অবকাঠামো নয়,যাত্রীদেরও দায় আছে। অনেক সময় যাত্রীরা নিজেরাই ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রীবাহী গাড়িতে ওঠেন বা চালককে দ্রুত চালাতে চাপ দেন। সড়ক নিরাপত্তা তাই একটি সম্মিলিত দায়িত্ব-এটি শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়।
সমাধানের পথ কী?
প্রথমত, আইন প্রয়োগে শূন্য সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। সড়কে নিয়ম ভাঙলে তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে-স্পিড ক্যামেরা, ডিজিটাল মনিটরিং, ফিটনেস ট্র্যাকিং ইত্যাদি চালু করা জরুরি।
চতুর্থত, গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে, যাতে প্রতিযোগিতামূলক বেপরোয়া গতি বন্ধ হয়।
পঞ্চমত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে-স্কুল, কলেজ ও গণমাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। সড়ককে আমরা এখনও প্রতিযোগিতার জায়গা হিসেবে দেখি, সহযোগিতার জায়গা হিসেবে নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো না গেলে কোনো উদ্যোগই স্থায়ী ফল দেবে না।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর আমরা শোক প্রকাশ করি,দোষারোপ করি,কিছুদিন আলোচনা করি-তারপর আবার সব ভুলে যাই। এই চক্র ভাঙতে হবে। কারণ প্রতিটি প্রাণের মূল্য অপরিসীম। একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষকে হত্যা করে না; এটি একটি পরিবারকে ধ্বংস করে, সমাজে সৃষ্টি করে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব।
আজ সময় এসেছে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার। নৈরাজ্যের সড়ক থেকে বেরিয়ে এসে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, নিরাপদ সড়কব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নইলে এই নীরব প্রশ্ন-‘শৃঙ্খলা ফিরবে কবে?’-একদিন আমাদের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সব অর্জনকে ম্লান করে দেবে।
লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,ভাইস-চেয়ারম্যান নিরাপদ সড়ক চাই।
