এস এম আজাদ হোসেন: বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা আজ এমন এক জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে, যার ভয়াবহতা শুধু প্রাণহানির সংখ্যায় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, নীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে আরও গভীর হয়ে উঠছে। দেশের সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন সময় আন্দোলন, পুনর্গঠন উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রণয়ন, নজরদারি বৃদ্ধি-সবই হয়েছে; কিন্তু প্রকৃত ফলাফল এখনও সন্তোষজনক নয়। কারণ, সড়ক নিরাপত্তা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়-এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অগ্রাধিকার দাবি করে।
১) সড়ক দুর্ঘটনার মূল সমস্যাগুলো সুস্পষ্ট-সমাধান রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়
গত এক দশক ধরে প্রতি বছর গড়ে সাত থেকে আট হাজার মানুষের মৃত্যু, কয়েকগুণ মানুষের পঙ্গুত্ব এবং পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, সড়ক ব্যবস্থাপনা কতটা ভঙ্গুর।
দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো নতুন নয়-
ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল
অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক
দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
সড়ক নির্মাণে অনিয়ম ও নিম্নমান
যাত্রী ও মালিকপক্ষের নৈরাজ্য
আইন প্রয়োগে সমন্বয়হীনতা
গণপরিবহনে রাজনৈতিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট
প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমস্যার সমাধান সম্ভব ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। কারণ, অনেক সিদ্ধান্তই রাজনৈতিক ঝুঁকি বা স্বার্থের কারণে নেওয়া হয়নি বা অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
২) আইন আছে-কিন্তু বাস্তবায়নে ভয়াবহ দুর্বলতা
২০১৮ সালে ছাত্র আন্দোলনের পর কঠোর সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু পরপরই সেই আইনে ছাড় দেওয়া হয় বিভিন্ন সংগঠনের চাপে। আইন কার্যকর করতে গেলে মালিক-চালক সংগঠনের বাধা, পরিবহন ধর্মঘট, রাজনৈতিক চাপ প্রশাসনকে প্রায়ই ব্যাহত করে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংখ্যা বেশি-পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন-কিন্তু কেন্দ্রীয় সমন্বয় নেই। যার ফলে আইন আছে, কিন্তু বাস্তবিকভাবে একে কার্যকর করার শক্তিশালী মেকানিজম নেই।
এ অবস্থায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া আইন প্রয়োগ শুধু কাগজে-কলমে সীমিত থাকে।
৩) সড়কের সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নে দুর্নীতি একটি বড় বাধা
সড়ক নির্মাণে দুর্নীতি, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, নিয়ম না মেনে সড়ক মেরামত-এসব কারণে সড়কগুলো দ্রুত ভেঙে পড়ছে। বর্ষায় পানি জমে সড়ক নষ্ট হয়, শুকনোর মৌসুমে পশ্চিমা ধুলাবালির মতো গর্তে ভরা রাস্তায় যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
যেখানে উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ সড়ক খাতে ব্যয় হয়, সেখানে প্রতি বছর একই সড়ক মেরামত প্রশ্ন তোলে-এ টাকা কোথায় যাচ্ছে?
দুর্নীতি রোধের শক্তিশালী রাজনৈতিক নির্দেশনা ও কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা শুধুই বাক্যবাণী হয়ে থাকবে।
৪) জনসচেতনতা জরুরি-কিন্তু নেতৃত্বের উদাহরণ আরও জরুরি
বছরের পর বছর প্রচারণা চলছে-হেলমেট পরুন, নিয়ম মেনে চলুন, দ্রুতগতি নয়।
কিন্তু বাস্তবে জনসচেতনতা একা সমাধান না।
নাগরিকেরা যখন দেখেন-
অবৈধ রিকশা বা মোটরসাইকেলকে পুলিশ ছাড় দিচ্ছে
রাজনৈতিক নেতার গাড়ি বিপজ্জনক গতিতে যাচ্ছে
গণপরিবহনে দ্বিগুণ ভাড়া ও প্রতিযোগিতায় নৈরাজ্য
পথচারীর জন্য ফুটপাত অবৈধ দখলে
তখন মানুষ নিয়ম মানতে অনুপ্রাণিত হয় না।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নিয়ম মানার স্পষ্ট বার্তা ও উদাহরণ প্রয়োজন। নেতৃত্ব যদি নিয়ম ভঙ্গকারীদের রক্ষাকবচ না হয়, বরং কঠোর অবস্থানে থাকে, তবে আচরণগত পরিবর্তন দ্রুতই দৃশ্যমান হয়।
৫) পরিবহন খাতের রাজনৈতিক সিন্ডিকেট-সবচেয়ে বড় বাধা
বাংলাদেশে পরিবহন খাত দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে। তারা মালিক–চালক সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করে, ধর্মঘট ডাকে, আইন বিরোধী দাবি তোলে এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। এই অস্বাভাবিক শক্তি আইন প্রয়োগকে বারবার ব্যাহত করেছে।
যখন একটি খাত রাষ্ট্রকে জিম্মি করে ফেলে, তখন দুর্ঘটনাও যেন অনিবার্য।
এই সিন্ডিকেট ভেঙে আধুনিক পরিবহননীতি বাস্তবায়ন শুধুমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে সম্ভব।
৬) সড়ক নিরাপদ করতে যে পাঁচটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জরুরি
(১) আইন কঠোরভাবে প্রয়োগে কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স
একটি শক্তিশালী সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের অধীনে পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশনের সমন্বয় জরুরি।
(২) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবহন খাত
মালিক-চালক সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক ছত্রছায়া থেকে সরিয়ে পেশাভিত্তিক নীতিতে আনা।
(৩) সড়ক নির্মাণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
মান যাচাই, হঠাৎ পরিদর্শন এবং অনিয়ম ধরা পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বাস্তব পদক্ষেপ।
(৪) গণপরিবহনে আধুনিকায়ন ও রুট র্যাশনালাইজেশন
বাসের প্রতিযোগিতামূলক দৌড় বন্ধ করতে রুটভিত্তিক শৃঙ্খলা ও একীভূত টিকিটিং ব্যবস্থা কার্যকর করা।
(৫) শিক্ষা,সচেতনতা ও প্রযুক্তি ব্যবহার
স্কুল-কলেজে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, স্মার্ট ট্র্যাফিক সিস্টেম, সিসিটিভি ও ডিজিটাল মনিটরিং বাড়ানো।
৭) রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সড়ক নিরাপত্তার মূল চালিকা শক্তি
শুধু আইন বা প্রকল্প দিয়ে সড়ক নিরাপদ হয় না-এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক সংকল্প।
যে সরকার সড়ক নিরাপত্তাকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’ হিসেবে ঘোষণা করবে এবং প্রয়োজনে ভোট–ঝুঁকি নিয়েও পরিবহন খাত সংস্কারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে, সেই সরকারের সময়েই সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
দেশের মানুষ প্রতিদিন ঘর থেকে বের হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে-এটি কোনো সভ্য সমাজের চিত্র নয়। নিরাপদ সড়ক নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সড়ক নিরাপদ হবে-যখন রাজনৈতিক সদিচ্ছা অটল হবে
বাংলাদেশ বহু সংকট থেকে উত্তরণ দেখেছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণে-স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠার নানা আন্দোলন এর প্রমাণ।
সড়ক নিরাপত্তাও সেই তালিকায় যুক্ত হতে পারে, যদি নেতৃত্ব সত্যিকার অর্থেই সড়ককে মৃত্যুফাঁদ থেকে মুক্ত করার ঘোষণা দেয়।
অতএব, সময় এসেছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়ার-
সড়ক নিরাপত্তা দয়া নয়, এটি জাতীয় অগ্রাধিকার।
সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে, কারণ প্রতিদিনের প্রতিটি জীবনই অমূল্য-এবং তা রক্ষার ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে।
লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট।মহাসিচিব-নিরাপদ সড়ক চাই।
