প্রতারণার মামলায় বড় বোনের হয়ে কারাগারে যাওয়ার অভিযোগে ছোট বোনকে তিন দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার এ আদেশ দেন ঢাকার মহানগর হাকিম কামাল উদ্দীন। বাদীপক্ষের আইনজীবী কাইয়ুম হোসেন নয়ন জানান, রিমান্ডে যাওয়া ব্যক্তির নাম ভাবনা। খবর বিডিনিউজের।
গত মঙ্গলবার বড় বোন শারমিন আক্তার একার পক্ষে ছোট বোন আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যান বলে অভিযোগ। বৃহস্পতিবার এ আসামির রিমান্ড শুনানিকালে বাদী পক্ষে দাবি করা হয়, কাঠগড়ায় উপস্থিত নারী আসল আসামি নন। তিনি অন্য কেউ।
এমন তথ্যে আদালত ওই নারীকে মুখ দেখাতে বলেন। তখন আসামির জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারীর মিল পাওয়া যায়নি।
এই নারী আসামি শারমিন আক্তার একা কি না তা যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দিতে তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন বিচারক।
এই নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে গত ১৫ মে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার এসআই মাহবুবুল আলম।
আবেদনে বলা হয়, শারমিন আক্তার একা পরিচয়ে রাজু আহমেদ রাজিবের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন এই নারী। আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরবর্তীতে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। গত ১৪ মে শুনানিকালে মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, কাঠগড়ায় থাকা ব্যক্তি প্রকৃত পক্ষে আসামি শারমিন আক্তার একা নন। আটক থাকা ব্যক্তি একা কি না তা যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছে আদালত। কিন্তু তিনি জেলে থাকায় তার সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বা যাচাই করা যায়নি। এ আসামি প্রকৃতপক্ষে শারমিন আক্তার একা কি না তা যাচাইয়ের জন্য তার এনআইডি, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদপত্র ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।
আদালত আসামির উপস্থিতিতে শুনানির দিন রাখেন সোমবার। এদিন শুনানিকালে আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন রিমান্ড আবেদন বাতিল করে জামিন প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, ‘তিনি শারমিন আক্তার একা না, ভাবনা। তিনি মামলার আসামি না। বোনের হয়ে প্রক্সি দিয়েছেন, প্রমাণ হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ভিন্ন মামলা হবে। যেহেতু আসামি নয়, ভুল স্বীকার করেছি। তার অব্যাহতি চাচ্ছি।’
বাদীপক্ষের আইনজীবী রকিবুল ইসলাম ও কাইয়ুম হোসেন নয়ন রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। শুনানি নিয়ে আদালত তার তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেয়।
প্রাচীন পিলারের ব্যবসার প্রলোভন দেখিয়ে, ‘কুফরি-কালাম, শয়তানের নিঃশ্বাসের’ মাধ্যমে এক ব্যবসায়ী ও প্রবাসীর কাছ থেকে ‘প্রতারণামূলকভাবে’ ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে একটি চক্রের বিরুদ্ধে এ মামলা চলছে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ভয়-ভীতি দেখিয়ে চক্রটি ১৪-১৬ কোটি টাকার জমিও লিখে নিয়েছে।
এ ঘটনায় আজিজুল আলম নামের ওই ব্যবসায়ী উত্তরা পূর্ব থানায় চক্রের ২৪ সদস্যের নামে মামলা করেন।
মামলার পর শাখাওয়াত হোসেন শিমুল, নাজমুল হাসান, এ আর রহমান ও আবু ইবনে বিন আব্বাস ওরফে তুষারকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদের মধ্যে শিমুল ও নাজমুল জামিন পেয়েছেন।
আজিজুল মামলায় অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি তার বন্ধু মনিরের মাধ্যমে মিজান তার কাছে যায়। তার বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না জানতে চায়। আজিজুল জানান, আছে। পরে মাজহারুল ইসলাম সোহেল ফকির, নাজমুল হাসান ও কামাল তার অফিসে গিয়ে জানায়, প্রাচীন পিলার বিদেশে বিক্রি করে বিদেশি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন’ টাকা আনবে। যার অর্ধেক আজিজুলকে দেবে।
‘সোহেলের সুন্নতি লেবাস ও চটকদার কথাবার্তায় আজিজুল বিশ্বাস অর্জন করেন। এরপর থেকে তার কারসাজি শুরু হয়। বিশ্বাস অর্জনের পর তাকে বিভিন্ন কুফরি কালাম ও শয়তানের নিঃশ্বাস ব্যবহার করে হিপনোটাইজ করে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর তারা কোটি কোটি টাকা, স্বর্ণালংকার, জায়গা-জমি হাতিয়ে নেওয়া শুরু করে।’
‘তাদের কাছে অলৌকিক ও জ্বিনের মাধ্যমে মূল্যবান প্রাচীন পিলার ম্যাগনেট এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে আসতে পারে বলে জানায়। এরপর তারা তার অফিসে মাঝে মধ্যে যাতায়াত শুরু করে এবং তাকে বিভিন্ন ধরনের খাবার ও মিষ্টি খাওয়ায়। খাবার খাওয়ার পর থেকে তার মাথায় কাজ করছিল না। আজিজুল তাদের অনুগত হয়ে যান। তারা যা বলে তারা তাই করে।’
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ‘কিছুদিন পর আবার জ্বিনের মা পরিচয়ে এক নারী তাকে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন দেয়। তারপর থেকে নাজমুল ও সোহেল এবং অন্যদের মাধ্যমে তার কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নিতে থাকে। বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে তারা তার কাছ থেকে নগদ কয়েক কোটি টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নেয়।’
‘পরবর্তীতে জ্বিনের বাদশা (রাসেল) তাকে ফোন করে বলে সোহেল ও নাজমুলকে পাঠিয়েছে। তাদের কাছে ৫ কোটি টাকা দিয়ে দে। যদি না দিস তাহলে তোর ক্ষতি হবে। এভাবে ২০২৫ সালের ১৫ মে পর্যন্ত তারা বিভিন্ন সময় ২০ কোটি পাঁচ লাখ টাকা প্রতারণা করে নিয়ে নেয়।’
এছাড়া তার উত্তরখান এলাকা ১৪-১৬ কোটি টাকার ২৭ দশমিক ১৫ কাঠা জমি লিখে নেয় বলে অভিযোগ করেন বাদী।
এদিকে মামলার চার আসামি শারমিন আক্তার একা, লাইলী শাহনাজ খুশি, এ আর রাসেল ও আব্বাসের পক্ষে মামলা পরিচালনা করতেন আইনজীবী রাজু আহম্মেদ রাজিব।
এ ঘটনার পর নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে রবিবার আদালতে করা এক আবেদনে তিনি মামলার আইনজীবী হিসেবে অব্যাহতি চান। আদালত তার আবেদন নথিভুক্ত করেছে।
এদিকে রিমান্ড শুনানিতে বিচারক বলেন, ‘ওই আইনজীবীর লাইসেন্স বাতিল করা দরকার।’
