রাজধানীর কৌশলগত সংসদীয় আসন ঢাকা-১০ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শেখ রবিউল আলমের নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ায় এলাকায় উচ্ছ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে শুধু আনন্দ নয়—বাসিন্দারা একটি সুস্পষ্ট বার্তাও পাঠাচ্ছেন—ধানমন্ডি ৩২ ঘিরে দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র প্রতীকী প্রভাবকে পেছনে ফেলে উন্নয়ন ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতি দেখতে চান তারা।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে শেখ রবিউল আলম দায়িত্ব পান সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের। দেশের যোগাযোগ খাতের এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় এক হাতে পাওয়ায় ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, কলাবাগান ও নিউমার্কেট এলাকায় নতুন রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ৩,৩০০ ভোট ব্যবধানে জয়ী হন শেখ রবিউল আলম। তিনি পান ৮০,৪৩৬ ভোট, আর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পান ৭৭,১৩৬ ভোট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এটিকে ‘পরিবর্তনের ভোট’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এই ফলাফল প্রমাণ করে—ঢাকা-১০বাসীর কাছে প্রতীক নয়, বাস্তব ইস্যুই প্রাধান্য পায়।
ঢাকা-১০ আসন গঠিত হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-এর ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ২২ ও ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে। মোট ভোটার ৩,৮৮,৬৬০ জন। অভিজাত ধানমন্ডি, হাজারীবাগের শ্রমজীবী এলাকা, নিউমার্কেটের ব্যস্ত ব্যবসায়িক কেন্দ্র এবং কলাবাগানের আবাসিক অঞ্চল—এই বৈচিত্র্যময় সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও বেশি।
এই আসনের রাজনৈতিক ইতিহাসও তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৯ সালে আতাউদ্দীন খান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-১০ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি এর আগে ১৯৬৫ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তানের সংসদ সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর মন্ত্রিসভায় অর্থ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালে জনতা দলে যোগ দিয়ে শ্রম ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী হন। পরে জেনারেল হুসেন মুহাম্মদ এরশাদ-এর শাসনামলে গ্রেফতার হন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন—যা দলটির জন্যও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে।
সদ্য মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম যুগান্তরকে জানান, আমাদের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে জনগণের জন্য এবং দেশ গঠনে করণীয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। ইনশাল্লাহ, আগামী দিনে জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়ে সবাইকে নিয়ে সেই কার্যক্রম চালিয়ে যাব। বেশি বক্তব্য নয়—কাজের মাধ্যমে নিজেকে জনগণের সামনে তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা, নাগরিক সমস্যার সমাধান এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া তার অগ্রাধিকার।
মন্ত্রী হিসেবে শেখ রবিউল আলমের হাতে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে, সড়ক উন্নয়ন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, রেলপথে যাত্রীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারবে এবং টিকেট কালোবাজারির বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ হবে। এছাড়াও নদী পথে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা হবে এবং অভ্যন্তরীণ নৌ সংক্রান্ত সব বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিক, স্বচ্ছ ও জনসেবামূলক হবে, যা সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ধানমন্ডি ৩২-এর রাজনৈতিক গুরুত্বও ঢাকা-১০-এ অসামান্য। এখানে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর—যা শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন ছিল। সমর্থকদের কাছে এটি ঐতিহাসিক স্মৃতির কেন্দ্র হলেও, বিরোধী রাজনৈতিক বলয়ের কাছে এটি অতীতের একদলীয় প্রভাব ও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রতীক।
স্থানীয়রা বলেন, আমরা চাই না কোনো একক প্রতীক আবার এই এলাকার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিকট হোক। আমাদের চাওয়া উন্নয়ন, সুশাসন আর নাগরিক সমস্যার সমাধান।
হাজারীবাগের ডিএসসিসি ২২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারসিদুল রহমান সাদ, নিউমার্কেট থানা যুবদলের সদস্য সচিব কে এম চঞ্চল, মোহাম্মদ হুমায়ুন, পশ্চিম ধানমন্ডি জিগাতলার মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, মোহাম্মদ সামির আহমেদ, মোহাম্মদ শহিদুল, কামরাঙ্গীরচরের ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের মো. দ্বীন ইসলাম, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর পাটুয়ারী, নিউমার্কেটের মো. মতিউর রহমান, মোহাম্মদ আশিকুর রহমান, মো. ফারুক হোসেন এবং হাজারীবাগের মোহাম্মদ আবুল খায়ের লিটন—তারা প্রত্যেকেই আশা প্রকাশ করেছেন, নতুন মন্ত্রীর হাত ধরে এলাকায় দৃশ্যমান উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
এলাকায় আনন্দ মিছিল ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশা এখন বাস্তব উন্নয়ন ঘিরে। সড়ক সংস্কার, যানজট নিরসন, বাজার ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন—এসবই এখন প্রধান দাবি। বিশেষ করে হাজারীবাগের পরিবেশ দূষণ, নিউমার্কেট এলাকার ট্রাফিক চাপ এবং ধানমন্ডির অভ্যন্তরীণ সড়কের অব্যবস্থাপনা দ্রুত সমাধানের দাবি তুলছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের মতে, ধানমন্ডি ৩২-এর প্রতীকি আবেগ ও বিভাজনের রাজনীতি পেরিয়ে কার্যকর উন্নয়নমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ঢাকা-১০ হতে পারে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উদাহরণ। মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে দেশের যোগাযোগ খাতের বড় দায়িত্ব সামলানো, অন্যদিকে নিজের নির্বাচনি এলাকায় এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যেখানে নাগরিক প্রত্যাশাই হবে প্রধান চালিকাশক্তি।
