রোববার (৭ জুন) দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কার্যালয়ে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা), প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ, বাংলাদেশে ডিএইচএল এক্সপ্রেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিয়ারুল হক, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ কাস্টমস ক্লিয়ারিং এন্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মিজানুর রহমান, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, সিএন্ডএফ এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে তদন্ত কমিটি জানায়, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা তথ্য-উপাত্ত, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট দুজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে।
কমিটির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, ঘটনাস্থল থেকে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আগুন লাগার সময় ঘটনাস্থলে থাকা দুই ব্যক্তির আচরণে তাৎক্ষণিক কোনো তীব্র আতঙ্ক বা প্যানিকের লক্ষণ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়নি।
তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, সব তথ্য-প্রমাণ ও আলামত যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, প্রাথমিকভাবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের ঘটনা ঘটতে পারে।
তবে তিনি এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘শর্ট সার্কিট হবে কেন? এর আগেও যে অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল, সেখানেও তদন্ত প্রতিবেদনে শর্ট সার্কিটের কথা বলা হয়েছিল। তাহলে নিশ্চয়ই কোথাও গাফিলতি রয়েছে। আমাদের তা স্বীকার করতে হবে।’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘কমিটিকে দ্রুত প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। যদি কারও গাফিলতির কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে খুব কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’
গত শুক্রবার (৫ জুন) রাত ১১টা ২৫ মিনিটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো বিভাগের ৯ নম্বর গেটসংলগ্ন একটি কুরিয়ার কনটেইনারে আগুন লাগে। খবর পেয়ে বিমানবন্দরের নিজস্ব ফায়ার ফাইটিং ইউনিট এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ফলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।
ঘটনার পর আগুনের কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
বৈঠকে উঠে এলো কার্গো ব্যবস্থাপনার নানা সংকট
বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সিএন্ডএফ সংশ্লিষ্টরা কার্গো ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কার্গো এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত জায়গা নেই; পণ্য সংরক্ষণে আধুনিক গুদাম ও পৃথক নিরাপদ জোনের অভাব রয়েছে; ফায়ার সেফটি অবকাঠামো ও জরুরি প্রবেশপথ পর্যাপ্ত নয়; প্রয়োজনীয় লোডিং-আনলোডিং যন্ত্রপাতি ও হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্টের ঘাটতি রয়েছে; পণ্য জটের কারণে অনেক সময় কার্গো দীর্ঘ সময় ধরে গুদামে পড়ে থাকে, যা ঝুঁকি বাড়ায়।
তাদের মতে, শুধু আগুন লাগার তাৎক্ষণিক কারণ খুঁজে বের করলেই হবে না; বরং পুরো কার্গো ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
আগের ঘটনার সঙ্গে মিল নিয়ে প্রশ্ন
বৈঠকে কয়েকজন অংশগ্রহণকারী উল্লেখ করেন, অতীতের অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রেও শর্ট সার্কিটের বিষয়টি উঠে এসেছিল। ফলে বারবার একই ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আসায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণের মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বৈঠকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, এটি কেবল প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ। আগুনের প্রকৃত কারণ, দায়-দায়িত্ব এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা ছিল কি না, তা চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
প্রসঙ্গত, এ বিষয়ে সোমবার সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
