ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে প্রচারের সময় যখন মাধার বদরুদ্দিনের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় সামনে আসে, তখন খুব কম লোকই ভেবেছিলেন তার জেতার কোনো সম্ভাবনা আছে।
বদরুদ্দিন তামিলগা ভেট্টি কাজগম (টিভিকে) নামক রাজনৈতিক দলের সদস্য।
বিপরীতে তার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী-প্রভাবশালী আঞ্চলিক দল দ্রাবিড় মুনেত্র কাজগম (ডিএমকে) এবং অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজগম (এআইএডিএমকে)-র প্রার্থীরা বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, উচ্চকিত প্রচারণা এবং হেভিওয়েট সিনিয়র নেতা ও তারকাদের নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন।
কিন্তু গত সপ্তাহে বদরুদ্দিন তার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের ১৯ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।
‘আমার একমাত্র শক্তি ছিল আমাদের নেতা বিজয় এবং দলের নির্বাচনী প্রতীক (একটি বাঁশি)। আমাদের নেতার নীতির ভিত্তিতে আমি প্রচার করেছি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে,’ বলেন বদরুদ্দিন।
তিনি একাই চমক দেখাননি। টিভিকে প্রার্থীরা—যাদের বেশিরভাগই নতুন মুখ—জিতেছেন ১০৮টি আসন, ফলে ২৩৪ সদস্যের তামিলনাড়ু বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার থেকে বিজয়ের দল মাত্র ১০ আসন পিছিয়ে থাকে। এটি ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন।
কয়েকদিন অনিশ্চয়তার পর পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন কি না তা নিয়ে সংশয়ের মধ্যে রোববার বিজয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে সাধারণত অর্থ, জাত ও ধর্মের আধিপত্য দেখা যায়। রাজ্যের অন্যতম পরিচিত মুখ হওয়া সত্ত্বেও বিজয় ব্যক্তিগতভাবে তিন সপ্তাহেরও কম সময় প্রচার চালান।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে তার এক সমাবেশে পদদলনে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হওয়ার পর তিনি দুই মাসেরও বেশি সময় প্রচার থেকে বিরতি নেন। কিছু জায়গায় সময়ের অভাব ও লজিস্টিক জটিলতার কথা বলে তার সমাবেশ বাতিল করা হয়।
তাহলে কীভাবে বদরুদ্দিনের মতো কম দৃশ্যমান প্রার্থীরা জিতলেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া।
পর্দার আড়ালে, টিভিকের হাজার হাজার ‘সোশ্যাল মিডিয়া যোদ্ধা’ অনলাইনে বিজয় ও তার প্রার্থীদের পক্ষে নিরলস প্রচার চালান।
ব্যাঙ্গালোরভিত্তিক মিডিয়া কৌশলবিদ অনুপ চন্দ্রশেখরনের ভাষায়, সম্ভবত ভারতে এটাই প্রথম নির্বাচন, যা প্রায় পুরোপুরি সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে জেতা হয়েছে।
ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুকসহ নানা প্ল্যাটফর্ম কৌশলে ব্যবহার করে ‘বিজয়ের সমর্থকরা একটি ডিজিটাল বিপ্লব সূচনা করেছেন,’ তিনি বলেন।
ভারতে নির্বাচন সাধারণত মাঠে নেমে লড়া হয়-বড় সমাবেশ, উত্তপ্ত ভাষণ, ব্যানার, বাড়ি বাড়ি প্রচার এবং আগ্রাসী মিডিয়া উপস্থিতির মাধ্যমে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন বাজার হিসেবে ডিজিটাল প্রচারের ভূমিকা থাকলেও বিজয়ের সমর্থকরা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন।
গত বছর সক্রিয় রাজনৈতিক প্রচার শুরু করার পর বিজয় কোনো মিডিয়া সাক্ষাৎকার দেননি, সংবাদ সম্মেলনও করেননি। তার প্রকাশ্য ভাষণগুলোও ছিল অন্য নেতাদের তুলনায় বেশ সংক্ষিপ্ত। এর বদলে তিনি সোশাল মিডিয়ায় সরাসরি সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তবে বিজয়ের প্রতিটি উপস্থিতি অনলাইনে নিরবচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তার ভাষণ ও একক সংলাপগুলোকে ইনস্টাগ্রাম রিলস ও ইউটিউব শর্টসে রূপান্তর করা হয়, এরপর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে পুরোনো ও নতুন সমর্থকরা ‘বাঁশি’ প্রতীকে ভোট দেন, নতুন নেতৃত্ব থেকে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশায়।
যেমন, মাদুরাই শহরে এক দলীয় সম্মেলন থেকে নেওয়া বিজয়ের একটি সম্পাদিত সেলফি ভিডিও ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৯ কোটি বার দেখা হয়।
তার বহু চলচ্চিত্রে তিনি দুর্নীতি, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক ক্রুদ্ধ মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেছেন বঞ্চিত ও কণ্ঠহীন মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো একজন মানুষ হিসেবে সামাজিক ন্যায়ের রক্ষক হিসেবে। এতে ভক্তদের মধ্যে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
বিজয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি ছিল তার প্রায় ৮৫ হাজার ফ্যান ক্লাবের নেটওয়ার্ক, যা তিনি তামিল চলচ্চিত্র শিল্পে ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে যত্ন করে গড়ে তুলেছেন। দুই বছর আগে দল গঠনের পর এই বিশাল ফ্যানবেজ একটি সংগঠিত রাজনৈতিক যন্ত্র ও পরিশীলিত অনলাইন বাহিনীতে রূপ নেয়– যারা প্রচার সামগ্রী ও ভাষণের ক্লিপ ছড়িয়ে দেয়।
‘বিজয়ের সরাসরি উপস্থিতি সীমিত ছিল। কিন্তু ভার্চুয়াল প্রচারের সেই অদৃশ্য শক্তি ছিল অত্যন্ত কার্যকর। প্রচলিত জনমত জরিপ এবং পর্যবেক্ষকেরা এই প্রবণতা ধরতে পারেননি,’ ফলাফলের আগে রাজনৈতিক ঢেউ ধরা না পড়ার কারণ হিসেবে বলেন চন্দ্রশেখরন।
তিনি জানান, বিজয়ের প্রতিটি সমাবেশ দ্রুতই একটি ‘দ্বিতীয়’ ডিজিটাল জীবন পেত। তার দল ও সমর্থকেরা মিনিটের মধ্যেই ভাষণগুলোকে ঝরঝরে ছোট ক্লিপে রূপান্তর করে ইউটিউবসহ নানা প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিত।
দলের শক্তিশালী ও সুসংগঠিত তথ্যপ্রযুক্তি শাখাও প্রচার সামগ্রী তৈরি এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমালোচনার জবাব দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
‘এই কাজের ধারা সবকিছু একত্র করেছে-উপস্থিতি, বিষয়বস্তু, নেটওয়ার্ক, সময়, গতি ও প্রতীক-একটি একক ধারাবাহিকতায়,’ বলেন চন্দ্রশেখরন।
এই কৌশল জেন-জেড ভোটার ও নারীদের সঙ্গে বিশেষভাবে সাযুজ্যপূর্ণ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, এদের বড় একটি অংশ তাকে সমর্থন দিয়েছেন।
তামিলনাড়ুতে কোনো দলের জন্য ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ ছাড়াই এমন সাফল্য পাওয়া বিরল। তবে দীর্ঘমেয়াদে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন চন্দ্রশেখরন।
‘এই মডেলটি কাজ করেছে, কারণ বিজয় নতুন এবং তার ‘বাগেজ’ নেই। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তাকে কাজ করে দেখাতে হবে। দলের কাঠামোও শক্ত করতে হবে-শুধু ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রচার চালিয়ে যথেষ্ট নয়,’ তিনি বলেন।
শীর্ষ পদে দায়িত্ব নিতে গিয়ে অনেকেই তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তার দলের সহকর্মীরা উদ্বিগ্ন নন।
‘১৯৬৭ সালে ডিএমকে যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের কী ধরনের অভিজ্ঞতা ছিল? আমাদের লক্ষ্য পরিষ্কার প্রশাসন দেওয়া, আর আমাদের নেতা তা দিতে পারবেন,’ বলেন বদরুদ্দিন।
তামিলনাড়ুর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি ডিএমকে ও এআইএডিএমকের বিরুদ্ধে একাই লড়াই করে বিজয় যে ইতিহাস গড়েছেন, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে উদযাপনের মধ্যেই এই উপলদ্ধিও বাড়ছে যে রাজনীতিতে নির্বাচনে জয় কেবল শুরু।
থালাপতি বিজয় ও তার ভার্চুয়াল যোদ্ধাদের জন্য বাস্তব দুনিয়ার চ্যালেঞ্জ শুরু হলো এখন।
