২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ। আঠারো বছর বয়সী এক আর্জেন্টাইন তরুণ জার্মানির গেলসেনকির্চেনের মাঠে নেমেই গোল করলেন সার্বিয়া অ্যান্ড মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে। একই টুর্নামেন্টে পর্তুগালের হয়ে মাঠ কাঁপালেন আরেক তরুণ তুর্কি। বিশ্ব ফুটবল তখনো টের পায়নি, আগামী দুটি দশক এই দুই মহাতারকা নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলবেন।
বিশ বছর পর, ২০২৬ সালে এসে সেই দুই তরুণ এখন মধ্যবয়সী দুই কিংবদন্তি। লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এবারের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ সাক্ষী হতে যাচ্ছে এক মহাকাব্যিক সমাপ্তির— ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে নিজেদের ষষ্ঠ এবং ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। ক্রীড়াঙ্গন যাকে নাম দিয়েছে ‘দ্য লাস্ট ডান্স’।
মেসির তৃপ্তি বনাম নতুন রেকর্ডের হাতছানি
২০২২ সালে দোহার লুসাইল স্টেডিয়ামে যখন ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরলেন, মেসির ক্যারিয়ার তখন পূর্ণতা পেয়েছিল। ম্যাচ শেষে মেসি নিজেই বলেছিলেন, “আমি এভাবে ক্যারিয়ার শেষ করতে চেয়েছিলাম। এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই।”
সবাই ভেবেছিল ওখানেই শেষ। প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) ম্যাড়মেড়ে অধ্যায় চুকিয়ে মেসি পাড়ি জমালেন মার্কিন মুলুকের মেজর লিগ সকারে (এমএলএস)। ইন্টার মায়ামির হয়ে গত বছর জিতলেন এমএলএস কাপ। কিন্তু আলবিসেলেস্তেদের ১০ নম্বর জার্সির প্রতি টান কমেনি একটুও। ২০২৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই আর্জেন্টিনাকে জেতালেন কোপা আমেরিকা, আর লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে হলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা।
আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি তো পণই করেছেন, “মেসি যাতে বিশ্বকাপে থাকে, তার জন্য আমি সবকিছু করব।” দেশের হয়ে ২০০ ম্যাচের মাইলফলক থেকে মাত্র ২ ম্যাচ দূরে থাকা মেসি এবার ভাঙতে পারেন মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের বিশ্বরেকর্ড। বিশ্বকাপে মেসির বর্তমান গোল ১৩টি। আগামী ২৪ জুন ৩৯ বছরে পা দিতে যাওয়া মেসির সামনে এবার গ্রুপ পর্বে থাকছে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। রেকর্ডটি ভাঙা তাই খুব বেশি অসম্ভব নয়।
৪১ বছর বয়সীর অধরা স্বপ্নের তাড়না
মেসির চেয়ে বয়সে দুই বছরের বড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সে এসেও যার ফিটনেস আর গোলের ক্ষুধা তরুণদের লজ্জা দেবে। রিয়াল মাদ্রিদ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই সাবেক উইঙ্গার বর্তমানে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরের হয়ে লিগ জয়ের দ্বারপ্রান্তে। পর্তুগালের হয়ে ২০০৪ সালের ইউরো ফাইনাল হারের ক্ষত ২০১৬ সালে ইউরো জিতে মুছেছিলেন, কিন্তু সোনালী ট্রফিটা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
২০০৬ সালে পর্তুগালকে সেমিফাইনালে তোলার পর বিশ্বকাপে রোনালদোর রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে তাকে বসতে হয়েছিল সাইডবেঞ্চে। তবে নতুন কোচ রবার্তো মার্তিনেজ দায়িত্ব নিয়ে রোনালদোকে ফিরিয়েছেন প্রথম পছন্দের স্ট্রাইকার হিসেবে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে রেকর্ড ২২৬ ম্যাচ খেলা সিআরসেভেন সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন, এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ। তিনি বলেন, “আমার বয়স ৪১ বছর হতে যাচ্ছে এবং আমি মনে করি এটাই বিদায় নেওয়ার উপযুক্ত সময়।”
ডিআর কঙ্গো, কলম্বিয়া ও উজবেকিস্তানের গ্রুপে থাকা পর্তুগাল এবার শিরোপার অন্যতম দাবিদার। বিশ্বকাপে রোনালদোর গোল ৮টি, তবে নকআউট পর্বে এখনো কোনো গোল নেই তার। কোচ মার্তিনেজ অবশ্য রোনালদোকে নিয়ে বেশ আশাবাদী, “দলের জন্য সে একজন অবিশ্বাস্য অধিনায়ক এবং দেশের প্রতি তার নিবেদন উদাহরণ দেওয়ার মতো।”
কোয়ার্টার ফাইনালেই কি দেখা হচ্ছে দুই মহাতারকার?
ফুটবল বিধাতা কি শেষবারের মতো এই দুই জাদুকরকে একই মঞ্চে মুখোমুখি দাঁড় করাবেন? সমীকরণ কিন্তু বলছে, সম্ভাবনা প্রবল! আর্জেন্টিনা এবং পর্তুগাল— দুই দলই যদি নিজ নিজ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বের বাধা পার হতে পারে, তবে আগামী ১১ জুলাই কানসাস সিটিতে কোয়ার্টার ফাইনালেই দেখা হয়ে যেতে পারে মেসি ও রোনালদোর।
৪১ বছরের রোনালদো বনাম ৩৯ বছরের মেসি। ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা দুই নক্ষত্রের এই ‘শেষ নাচ’ দেখার জন্য এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।
