‘ভাতের হোটেল’ খ্যাত ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান (ডিবি) হারুন-অর-রশিদ যেখানে যেতেন সেখানেই তৈরি করতেন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের আখড়া। সেসব আখড়ায় নারী সরবরাহ করতেন আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদি।
শুধু তাই নয়, নিজের ‘গুডবয়’ চেহারার আড়ালে ‘ব্যাডবয়’ মেজাজের আফ্রিদি মাদকসহ নানা অপরাধেও জড়িত ছিলেন। আর সেসব অপরাধ বীরদর্পে চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি আশ্রয়-উৎসাহ পেতেন ডিবি হারুনের। তাকে ‘চাচা’ও ডাকতেন তৌহিদ আফ্রিদি। আর ‘কমিশন’ পাওয়ার কারণে হারুনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের পেছনে ছিলেন পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র মতে, কামালের যোগসাজশে তৌহিদ আফ্রিদি ও ডিবির হারুন একটি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চক্র গড়ে তুলেছিলেন। তাদের টার্গেট ছিলেন শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীরা। কোনো অপরাধ সংঘটিত করে টার্গেটকৃত শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীদের নাম জড়িয়ে দিয়ে তা মিডিয়াতে ছড়িয়ে দিত এ চক্র। এরপর সেই ফাঁদে আটকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিত তারা।
এমনই একটি ফাঁদ পাতা হয় আলোচিত মোসারাত জাহান মুনিয়ার মৃত্যুকে ইস্যু করে। ২০২১ সালের রমজান মাসে মুনিয়ার মৃত্যুর পর এর সঙ্গে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের নাম জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হতে থাকে। এর নেপথ্যে ছিল তৌহিদ আফ্রিদি ও হারুন-অর-রশীদদের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চক্র। শুরু হয় তাদের নোংরা খেলা।
বসুন্ধরা গ্রুপের কাছে ১০০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দিলে মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনার পুরো দায় বসুন্ধরা গ্রুপের ওপর চাপানো হবে বলে তারা হুমকি দিতে থাকে। যদিও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বসুন্ধরা এমডি সায়েম সোবহান আনভীর সেই ফাঁদ উতরে গেছেন। পরপর দুবার তিনি আদালত থেকে খালাস পেয়েছেন।
তৌহিদ আফ্রিদিকে গ্রেপ্তারের পর মুনিয়ার মৃত্যুর রহস্য খুলতে শুরু করেছে। বিষয়টিতে সায়েম সোবহানকে অহেতুক জড়ানোর বিষয়টিই সামনে আসছে। তৌহিদ আফ্রিদির ফাঁস হওয়া কলরেকর্ড থেকে জানা যাচ্ছে, মুনিয়ার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
এছাড়া এক নারী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে আফ্রিদি তাকে হুমকি দিয়ে বলেছে, ‘মুনিয়ার মতোই তোর অবস্থা হবে। ’ এ বিষয়টিকে সবাই মুনিয়ার মৃত্যু রহস্য উন্মোচনের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে মনে করছে। আর মুনিয়ার মৃত্যুর পেছনে আফ্রিদির জড়িত থাকার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক তদন্তে তারা এ ধরনের তথ্য পেয়ে যাচাই করছেন।
শুধু মুনিয়া ইস্যুই নয়, গণঅভ্যুত্থানকালের হত্যা মামলায় গত ২৪ আগস্ট বরিশাল থেকে তৌহিদ আফ্রিদি গ্রেপ্তারের পরপর তার আরও অপকর্মের বিষয়গুলো বেরিয়ে আসে।
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) একটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানা যায়, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন যেখানেই যেতেন সেখানেই একটি রঙ্গশালা তৈরি করতেন। রঙ্গশালার নারী সরবরাহের হোতা ছিলেন তৌহিদ আফ্রিদি।
সূত্রটির দাবি, ডিবির তৎকালীন প্রধান হারুন অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল ও দু-একজন মন্ত্রী ছাড়া বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর তৎকালীন কোনো কর্মকর্তাকে পাত্তা দিতেন না তিনি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি যা খুশি তাই করতেন। আর হারুনের ডেরায় নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন অনেক মন্ত্রী এমপি।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্যে, তৌহিদ আফ্রিদি অনেক তরুণীর সর্বনাশের কারিগর। তার বাবা টিভি চ্যানেলের দখলদার মালিক নাসির উদ্দিন সাথী। তাকে ক্ষমতার ‘পাওয়ার হাউস’ বানিয়ে আফ্রিদি সব অপকর্মের ‘ফুয়েল’ নিয়েছেন হাসিনার মন্ত্রী আনিসুল-কামালের কাছ থেকে।
মিথ্যা প্রেম-প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল, দখল, মদ-মাস্তি-নির্যাতনের মতো যত অপরাধ আছে, এসবের লাইসেন্স দিয়ে তার পাশে থেকেছেন ডিবি হারুন। বিনিময়ে ‘ফাঁদে’ আটকানো অসংখ্য সুন্দরী তরুণীকে দিয়ে নিজের বা চক্রের ঊর্ধ্বতনদের মনোরঞ্জন করেছেন। মাফিয়া হয়ে অহরহ এসব অপকর্মই ঘটিয়েছেন ধরা পড়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদি।
গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, অসংখ্য নারী কেলেঙ্কারি পাশাপাশি তার অনেক অপরাধ প্রমাণিত। আদালতে এসব উপস্থাপনে কাগজ-কলমে নথিভুক্ত করা হচ্ছে। এজন্য কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদির কাছ থেকে জব্দ করা ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
জব্দ করা ডিভাইস ফরেনসিকে পাঠানোর বিষয় সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন, সেগুলোর রিপোর্ট আসতে একটু দেরি হবে। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
মুনিয়ার মৃত্যু ও তদন্ত-আদালতের রায়
২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে আলোচিত মুনিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সে ঘটনার মামলায় বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরসহ আটজনের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা করা হয়।
তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানায়, আগের অভিযুক্তদের সংশ্লিষ্টতা মেলেনি। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।
তদন্তে হত্যা বা ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা খুঁজে না পাওয়ায় বসুন্ধরা গ্রুপের এমডিসহ সব আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। এর আগে মুনিয়ার বোন নুসরাতের করা ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’র প্রথম মামলায়ও পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন এবং আদালত থেকে খালাস পান বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীর।