মার্কিন প্রযুক্তি জগতের শীর্ষ ধনকুবেরদের মতো এবার মানুষের আয়ু বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে কোনো ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয় বরং কোষের বার্ধক্য ঠেকাতে এবং মানুষের অঙ্গ ‘মেরামত’ করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিপুল অঙ্কের এক মহাপ্রকল্প শুরু করেছেন তিনি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ‘নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজিস’ নামের এই প্রকল্পে রাশিয়ার সরকার অন্তত ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। তবে ক্রেমলিনের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী গবেষণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও সংশয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭৩ বছর বয়সী এই রুশ নেতার নির্দেশে চলা প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো এমন জিন-থেরাপি তৈরি করা, যা কোষের বার্ধক্যের গতিকে ধীর করে দিতে পারে। রাশিয়ার উপ-বিজ্ঞানমন্ত্রী দেনিস সেকিরিনস্কি একে বার্ধক্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক সম্ভাবনা বলে দাবি করেছেন। শুধু জিন থেরাপিই নয়, এই প্রকল্পের আওতায় শূকরের শরীরে মানুষের অঙ্গ তৈরি করে তা প্রতিস্থাপনের মতো জটিল বায়োপ্রিন্টিং প্রযুক্তি নিয়েও কাজ চলছে।
সরকারি অনুদানে গবেষণারত বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি ও মানুষের কার্টিলেজ টিস্যু তৈরিতে সফল হয়েছেন এবং চলতি দশকের শেষেই মানুষের সম্পূর্ণ অঙ্গ প্রতিস্থাপনের উপযোগী করে তৈরি করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে এই আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে পৌনে ২ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে বলে খোদ পুতিনও দাবি করেছিলেন।
এই বিশাল ও সংবেদনশীল উদ্যোগের নেতৃত্বে রয়েছেন পুতিনের নিজের কন্যা এবং হরমোন বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভোরোন্তসোভা। তার সাথে যুক্ত আছেন প্রখ্যাত রুশ পদার্থবিদ মিখাইল কোভালচুক, যিনি মনে করেন অদূর ভবিষ্যতে মানুষ নিজের প্রয়োজনমতো অঙ্গ প্রতিস্থাপন ও তা সারিয়ে তুলতে পারবে। তবে পুতিনের দীর্ঘায়ু লাভের এই মোহ নতুন কিছু নয়। বলা হয়ে থাকে, ১৯৬৮ সালের একটি সোভিয়েত চলচ্চিত্র দেখার পর ১৬ বছর বয়স থেকেই এই বিষয়ে এক ধরনের আচ্ছন্নতা তৈরি হয় তার মনে, যা পরবর্তীতে তাকে কেজিবিতে যোগ দিতেও অনুপ্রাণিত করেছিল। বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলাপকালেও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অনন্তকাল বেঁচে থাকা কিংবা বরফশীতল ক্রায়োথেরাপির উপকারিতা নিয়ে পুতিনকে কথা বলতে শোনা গেছে।
তবে এই বিপুল ব্যয়ের প্রকল্পকে ঘিরে সমালোচকদের সন্দেহের তীরও বেশ তীক্ষ্ণ। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মহলের একাংশ বলছেন, এই গবেষণার কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য বা ফলাফল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পর্যালোচনার জন্য প্রকাশ করা হয় না। ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশ ত্যাগ করা রাশিয়ার বায়োপ্রিন্টিংয়ের পথিকৃৎ আলেকজান্ডার অস্ত্রভস্কি জানান, কোনো গবেষণাপত্র প্রকাশিত না হওয়ার অর্থ হলো এর বাস্তব কোনো ফল মেলেনি।
সমালোচকদের মতে, দীর্ঘ দুই দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতাকে খুশি রাখতে এবং নিজেদের গবেষণার তহবিল নিশ্চিত করতেই বিজ্ঞানীরা পুতিনকে তার পছন্দের অবাস্তব স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। দীর্ঘায়ু নিয়ে পুতিনের এই অতিরিক্ত সচেতনতা এবং তার স্বাস্থ্য নিয়ে তৈরি হওয়া নানা গুজব ও বডি ডাবলের জল্পনার মধ্যেই রাশিয়ার এই ২৬ বিলিয়ন ডলারের ‘অমরত্ব প্রকল্প’ এখন টালমাটাল ভূরাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
