কিউবার সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে দুই দশক আগে মানবিক সহায়তা বহনকারী বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় অভিযোগ গঠনের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ খবর প্রকাশের পর দেশটিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। জ্বালানি সংকটসহ কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে থাকা কিউবায় এ পদক্ষেপকে বড় ধরনের চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৯৪ বছর বয়সী বিপ্লবী নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হলে তা হবে কিউবার ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ বাড়ানোর আরেকটি বড় পদক্ষেপ। ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ বলে আখ্যা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিবর্তনের জন্য চাপ দিয়ে আসছে।
এ বিষয়ে কিউবা সরকার সরাসরি কোনও মন্তব্য না করলেও শুক্রবার ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে কড়া বার্তা দেন।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও শক্তি প্রয়োগের হুমকি সত্ত্বেও কিউবা তার সমাজতান্ত্রিক উন্নয়নের পথে সার্বভৌম অবস্থান বজায় রাখবে।”
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স হাভানার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মতে, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা আরও পিছিয়ে যাবে এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সংকট গভীর হবে।
হাভানার স্কুলশিক্ষক সোনিয়া তোরেস বলেন, এমন পদক্ষেপ কিউবার জাতীয় মর্যাদার ওপর আঘাত হিসেবে দেখা হবে।
তার ভাষায়, “কিউবানদের সবসময় সামনে এগিয়ে যেতে হবে। যদি তারা রাউলের বিচার করতে চায়, তাহলে প্রয়োজনে আমরা লাঠি-পাথর নিয়েও কিউবাকে রক্ষা করব।”
যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে সংঘটিত কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর থেকে। বিপ্লবের পর কাস্ত্রো সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জোট গড়ে তোলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মালিকানাধীন ব্যবসা ও সম্পদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেন। এরপর থেকেই দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা তৈরি হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার ওপর আরও কঠোর অবস্থান নেয়। কার্যত জ্বালানি অবরোধ আরোপ, সামরিক পদক্ষেপের হুমকি এবং একের পর এক নিষেধাজ্ঞার ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলো কিউবা ছাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে কানাডীয় খনি কোম্পানি শেরিট ইন্টারন্যাশনালও রয়েছে।
কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা লেখক পিটার কর্নব্লুহ বলেন, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হলে তা দুই দেশের আলোচনার ‘কূটনৈতিক সমাপ্তি’ হিসেবে দেখা হতে পারে।
তার মতে, “এটি এক ধরনের চূড়ান্ত আল্টিমেটাম। এই অভিযোগ সামরিক অভিযান কিংবা রাউল কাস্ত্রোকে আটক বা হত্যার মতো পদক্ষেপের জন্য আইনি বৈধতার আবরণ তৈরি করতে পারে।”
অতীতেও যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগকে সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, “এরপরের লক্ষ্য কিউবা।”
যদিও রাউল কাস্ত্রো বর্তমানে কোনও সরকারি পদে নেই, তবুও তাকে এখনও কিউবার সবচেয়ে প্রভাবশালী জীবিত নেতা এবং বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
সম্ভাব্য অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ১৯৯৬ সালে মানবিক সহায়তাকারী সংগঠন ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’ পরিচালিত দুটি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা।
সে সময় কিউবা দাবি করেছিল, নিজেদের আকাশসীমা রক্ষার জন্যই বিমানগুলো ভূপাতিত করা হয়েছিল। তবে পরে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা তদন্তে জানায়, ঘটনাটি আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর ঘটেছিল।
ফিদেল কাস্ত্রো সে সময় বলেছিলেন, কিউবার সামরিক বাহিনী আগে থেকেই এমন নির্দেশনা পেয়েছিল। তবে তিনি দাবি করেন, তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাউল কাস্ত্রো বিমান ভূপাতিত করার সরাসরি নির্দেশ দেননি।
হাভানার বাসিন্দা এলিয়েসের দিয়াজ বলেন, তখন যেমন কিউবাকে আত্মরক্ষা করতে হয়েছিল, এখনও তেমনই পরিস্থিতি রয়েছে।
তিনি বলেন, “এটি ছিল এক ধরনের আগ্রাসন, আর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করতেই হয়। এখন যদি তারা রাউল কাস্ত্রোর বিচার করতে চায়, তাহলে আমি মনে করি সেটা ভুল হবে।”
